অনুসন্ধানী সাংবাদিকতা – ১ম পর্ব

বিষয় :: সাংবাদিকতা অনুসন্ধানী সাংবাদিকতা 

সাধারণভাবে সাংবাদিকতার কাজ দুইভাবে সম্পন্ন হয়ে থাকে। সাদামাটা এবং প্রাথমিকভাবে প্রাপ্ত তথ্যের ভিত্তিতে প্রস্তত করা সংবাদ প্রতিবেদন দৈনন্দিন সাংবাদিকতা। এর ভিত্তি নিত্যদিন ঘটে যাওয়া ঘটনাবলী। এর প্রকৃতি অগভীর ও সাধারণ এবং এর গল্পটি সাধারণত একমাত্রিক। এটি superficial বা সাদামাটা উপরিতলের গল্প। অন্যদিকে, অনুসন্ধানী সাংবাদিকতার মাধ্যমে যে সংবাদ প্রতিবেদন প্রস্তুত করা হয় তা একটি নির্দিষ্ট ঘটনা বা বিষয়ে গভীর অনুসন্ধান এবং এর পটভূমি বিস্তারিত গবেষণা ও পাঠের ভিত্তিতে গড়ে ওঠে এবং রচিত হয়।

দৈনন্দিন সংবাদিকতা:

নিত্যদিনের বা দৈনন্দিন ঘটে যাওয়া যেকোনো ঘটনাবলি কিংবা সরকারি-বেসরকারি দাপ্তরিক বা কর্তৃপক্ষের প্রকাশিত তথ্যের ভিত্তিতে, কিংবা সভা-সমাবেশ, সেমিনার-ওয়ার্শকপ, সংবাদ সম্মেলন, গবেষণা বা কোনো জরিপের প্রকাশিত ফলাফল, দুর্ঘটনা, প্রেস রিলিজ, প্রেসনোট, হ্যান্ডআউট, ব্রিফিং, ঘোষণা, নোটিস, দাবি-দাওয়া, প্রতিবাদ, আলোচনা, উদ্বোধন এবং সাধারণ বক্তব্য,  ইত্যাদির ভিত্তিতে প্রণীত সংবাদ প্রতিবেদন সাধারণ সাংবাদিকতা, সাধারণভাবে যার ধরন ও প্রকৃতি অগভীর, ভাসা ভাসা এবং আটপৌরে।

অনুসন্ধানী সাংবাদিকতা:

একটি নির্দিষ্ট ঘটনা বা বিষয়ের অন্তর্নিহিত সত্যানুসন্ধান, অনুসরণ, আবিষ্কার, উদঘাটন এবং উপস্থাপন অনুসন্ধানী সাংবাদিকতা। অনুসন্ধানী সাংবাদিকতায় ঘটনা বা বিষয়ের পটভূমি, কার্যক্রম, ধারাবাহিকতা এবং কালানুক্রম পর্যালোচনা ও পাঠ করা হয় এবং অনুসন্ধানের অংশ হিসাবে নিরলস অনুসরণ করা হয়। অনুসন্ধানী সাংবাদিকতার প্রক্রিয়ায় একজন সাংবাদিক তার পেশাগত মানদণ্ড, পদ্ধতি, প্রক্রিয়া এবং নৈতিকতা অক্ষুন্ন রেখে সত্য অনুসন্ধান, উন্মোচন, উদ্ঘাটন এবং বৃহত্তর জনস্বার্থে লব্ধ সত্য প্রকাশ করে।

অনুসন্ধানী সাংবাদিকতা প্রকৃতপক্ষে অন্তর্নিহিত সত্য ও ব্যাক্তি এবং গোষ্ঠীস্বার্থে লুকায়িত সত্য নিরলস অনুসন্ধানের মাধ্যমে আবিষ্কার এবং জনসম্মুখে প্রকাশের একটি পেশাদার প্রক্রিয়া। এর লক্ষ্য, ঘটনা বা বিষয়ের চূড়ান্ত সত্য উদঘাটন যার ভিত্তিতে সমাজের সদস্যগণ ও রাষ্ট্রের নাগরিকগণ রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক এবং নৈতিকতার প্রশ্নে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন।

পদ্ধতি বিবেচনায়, অনুসন্ধানী সাংবাদিকতা ঘটনা বা বিষয়ের পূর্ণাঙ্গ প্রেক্ষিত নির্মাণ করে গল্পের বহুমাত্রিক ও গভীর বিবরণের মাধ্যমে। এটি একটি পদ্ধতি অনুসরণ করে। এটি বিক্ষিপ্ত বা খন্ডিত হতে পারে না। এটি প্রেক্ষাপটে পরিবর্তন আনে এবং সত্যের সামগ্রিক চিত্রায়নের মাধ্যমে জনস্বার্থ ও জাতীয় স্বার্থ সুরক্ষা ও প্রতিষ্ঠা করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ও অবদান রাখে।

অনুসন্ধানী সাংবাদিকতার গুরুত্ব:

অনুসন্ধানী সাংবাদিকতা গভীর, প্রক্রিয়া-নির্ভর, গবেষণা-নির্ভর, বিস্তারিত পদ্ধতিগত পেশাদার কাজ যার মাধ্যমে ঘটনার অন্তরালের ঘটনা, উপরিভাগের দৃশ্যমান সত্যের অন্তরালের সত্য উদঘাঁটন ও উন্মোচন করে বৃহত্তর জনস্বার্থ রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভুমিকা রাখে।

অনুসন্ধানী সাংবাদিকতার বিষয়বস্তু এবং কাঙ্ক্ষিত সত্য অন্তরালে বা beneath the surface নিহিত ও লুকায়িত থাকে। ফলে অনুসন্ধানী সংবাদ প্রতিবেদনে এমন সব ঘটনা ও সত্য উন্মোচন করা হয়, যা অজ্ঞাত থাকলে একটি দেশ ও জনগণের বড় ধরনের ক্ষতি সাধিত হয়।

অনুসন্ধানী সাংবাদিকতার সংবাদ প্রতিবেদন সমাজে এবং নাগরিকের ভাবনা ও সিদ্ধান্ত গ্রহণে গভীর প্রভাব বিস্তার করে। অনুসন্ধানী সাংবাদিকতার মাধ্যমে উন্মোচিত এবং প্রকাশিত সত্য একটি সমাজে গণতন্ত্র, সুশাসন, স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা, জনস্বার্থ ও ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠায় বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে বলে বিশ্বাস করা হয়।

ব্যাক্তি ও গোষ্ঠীস্বার্থের পরিবর্তে সমাজ ও রাষ্ট্রের সমষ্টিগতস্বার্থ নিশ্চিত করা এবং সুশাসন প্রতিষ্ঠায় অবদান রাখা অনুসন্ধানী সাংবাদিকতার অন্যতম লক্ষ্য। অনুসন্ধানী সাংবাদিকতা এই লক্ষ্য বাস্তবায়নের প্রক্রিয়ায় গণতান্ত্রিক শাসন ব্যবস্থাকে শক্তিশালী করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।

অনুসন্ধানী সাংবাদিকতা প্রকৃত প্রস্তাবে সত্য অনুসন্ধানের একটি বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি:

দৃশ্যমান ঘটনাবলী এবং উপরিতলে অবস্থিত বিষয়াবলীর গভীরে প্রবেশ করে প্রকৃত সত্য উন্মোচন ও প্রকাশের মাধ্যমে দুর্নীতি, অন্যায় এবং আইনহত এবং নৈতিক বিচারে বৈধ নয় এমন ঘটনা প্রতিরোধ এবং সুশাসন প্রতিষ্ঠায় অনুসন্ধানী সাংবাদিক ভূমিকা রাখে। অনুসন্ধানী সাংবাদিকতায় দৃশ্যমান মুখোশ উন্মোচন ও সত্যের প্রকাশ ঘটে। (Investigative journalists tear the mask, go beneath the surface and what is visible and expose the truth).

বস্তুত, সাংবাদিকতার যে কোনো কাজেই কিছু না কিছু অনুসন্ধানী উপাদান থাকে। কারণ, ব্রিটিশ লেখক জর্জ অরওয়েলের মতে, সাংবাদিকতা হল এমন কিছু প্রকাশ করা, যা অন্য কেউ প্রকাশ করতে চাইবেনা।

তবে, অনুসন্ধানী সাংবাদিকতা হল এমনই এক পদ্ধতিগত পেশাদার কাজ যা দীর্ঘ সময় যাবত গভীর অনুসন্ধান, বিশ্লেষণ, গবেষণা ও পর্যবেক্ষনের মধ্য দিয়ে জনস্বার্থে এমন কোনো সত্য উদঘাটন, কিংবা দুর্নীতি কিংবা গুরুতর কোনো অনিয়মের ঘটনা প্রকাশ করা, যেখানে জাতীয়, রাষ্ট্রীয় সম্পদ লুন্ঠন, এবং জনস্বার্থ কিংবা মৌলিক নাগরিক অধিকার অথবা মৌলিক মানবাধিকার অথবা অন্যকোনো প্রকার স্বীকৃত অধিকার লঙ্ঘনের বিষয় থাকে, যা কোনো বিশেষ ব্যক্তি, কর্মকর্তা, গোষ্ঠী বা কর্তৃপক্ষ পদ্ধতিগতভাবে তাদের নিজেদের স্বার্থে গোপন রাখে কিংবা গোপন রাখতে চায়।

এক্ষেত্রে, অনুসন্ধানী সাংবাদিকতার ইউনেস্কোর সংজ্ঞাটি প্রণিধানযোগ্য “অনুসন্ধানী সাংবাদিকতার উদ্দেশ্য হচ্ছে গোপন বা লুকিয়ে রাখা তথ্য মানুষের সামনে তুলে ধরা। সাধারণত ক্ষমতাবান কেউ ইচ্ছাকৃতভাবে এসব তথ্য গোপন রাখে; কখনো হয়তোবা বিপুল ও বিশৃঙ্খলভাবে ছড়িয়ে থাকা তথ্যের মধ্যে লুকিয়ে থাকে, যা চট করে খুঁজে পাওয়া কঠিন। এই কাজের জন্য একজন সাংবাদিককে সাধারণত প্রকাশ্য ও গোপন নানা উৎস (সোর্স) ব্যবহার করতে হয়, ঘাটতে হয় নানা ধরনের নথিপত্র।”

অনুসন্ধানী সাংবাদিকের বৈশিষ্ট্য  

একজন সাংবাদিক  রাতারাতি বা overnight অনুসন্ধানী সাংবাদিক  হয়ে ওঠে না। অনুসন্ধিৎসা, কৌতুহল, দৈনন্দিন দৃশ্যমান ঘটনার গভীরের প্রশ্ন করার সক্ষমতা, তীক্ষ্ণ পর্যবেক্ষণ, বিস্তারিত পড়শুনা, নানা প্রকার ঝুঁকি এবং হুমকির মুখে দাঁড়িয়েও  অনুসন্ধানী সাংবাদিকতার কাজ নিয়ে অগ্রসর হবার সাহস, দৃঢ় অঙ্গীকার, আবেগ, উদ্যোগ, নিরলস পরিশ্রম করার মানসিক শক্তি এবং যেকোনো পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে অনুসন্ধানী কাজের পরিকল্পনায় পরিবর্তন গ্রহণ করার নমনীয়তা একজন অনুসন্ধানী সাংবাদিকের মৌলিক পেশাগত গুনাবলী এবং মানসিক দক্ষতার ও বৈশিষ্ট্যের মূল উপাদান।

অনুসন্ধানী সাংবাদিকতা নেহায়েত কোনো প্রাথমিক উৎস কিংবা সাধারণ টিপ-অফ এর উপর নির্ভর করে সাম্পাদন করা সম্ভব হয়না। এর জন্য সম্ভাব্য সকল উৎস সমূহের পারস্পারিক যাচাইকরণ এবং প্রাপ্ত তথ্য ও নথি-পত্র বিশ্লেষণের মাধ্যমে গভীর সত্যে উপনীত হতে হয়। অনুসন্ধানী সাংবাদিকতা একটি স্বাধীন পেশাদারি কাজ। অন্যের উপর কোনো রকম অপেশাদার নির্ভরতা এ কাজকে বাধাগ্রস্ত করে ব্যর্থ করে দিতে পারে।

অনুসন্ধানী সাংবাদিকতার আরেকটি বৈশিষ্ট্যটি হলো বস্তুনিষ্ঠতা এবং নিরপেক্ষতা, যা সাংবাদিকতার মৌল ভিত্তিও বটে। অনুসন্ধানী সাংবাদিকতার মূল লক্ষ্য জনস্বার্থ। তবে, জনস্বার্থ রক্ষা করতে গিয়ে অন্যের আইনি ও নৈতিক অধিকার ক্ষুন্ন করলে বস্তুনিষ্ঠতা থাকে না। এজন্য অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে মাননিয়ন্ত্রণের বিষয়টি খুব জরুরি।

অনুসন্ধান প্রক্রিয়ায় একজন সাংবাদিক সাংবাদিকতার পেশাগত নৈতিকতার মানদণ্ড বজায় রাখবে এবং অন্যের ব্যাক্তিগত গোপনীয়তা ভঙ্গ হয় কিংবা মানহানি হয় এমন কিছু করা থেকে বিরত থাকবে। কারণ এরকম কিছু ঘটলে সংশ্লিষ্ট সাংবাদিক প্রচলিত আইনে দোষী সাব্যস্ত হতে পারেন।

সর্বোপরি, একজন অনুসন্ধানী সাংবাদিক তার তথ্যের উৎস, সূত্র এবং তথ্য সরবরাহকারী ব্যাক্তির নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সর্বোচ্চ সতর্কতা অবলম্বন করবেন যেন তথ্য-সূত্র এবং তথ্য সরবরাহকারী ব্যাক্তি কোনোভাবেই হুমকির মুখে না পড়েন এবং তাদের যেন মর্যাদাহানি না হয়।     

…………………………………

 বিষয় .:জাতীয় শুদ্ধাচার কৌশল বাস্তবায়নে অনুসন্ধানী সাংবাদিকতার গুরুত্ব 

জাতীয় শুদ্ধাচার কৌশলপত্র এবং অনুসন্ধানী সাংবাদিকতার আদর্শগত, লক্ষ্যগত, সংজ্ঞাগত এবং ধারণাগত বিশ্লেষণের দিকে দৃষ্টিপাত করলে, পরস্পর নির্ভরতা, অন্তর্নিহিত যোগাযোগ এবং প্রথমটির লক্ষ্য অর্জনে পরেরটির অনিবার্যতার বিষয়টি সহজে পরিষ্কার হতে পারে।

বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক ২০১২ সালে গৃহীত জাতীয় শুদ্ধাচার কৌশলপত্র রাষ্ট্রীয় জীবনের এবং রাষ্ট্র পরিচালনার সকল স্তরে সুশাসন, স্বচ্ছতা, নৈতিকতা ও সততা নিশ্চিত করার একটি কৌশলগত জাতীয় দলিল।  

এই দলিলে শুদ্ধাচার বলতে, আচরণে ও দায়িত্ব পালনের সকল ক্ষেত্রে এমন এক উৎকর্ষতা ও মানের কথা বলা হয়েছে, যা সততা ও নৈতিকতা দ্বারা অনু্প্রাণিত ও প্রভাবিত। চরিত্রনিষ্ঠা ও প্রথাগত নৈতিকতার প্রতি আনুগত্য এর মূল কথা।

এই দলিলটিকে সামাজিক, রাষ্ট্রীয়, পরিবার ও ব্যক্তি জীবনের সকল স্তরে সততা এবং নৈতিকতার মান এবং আদর্শ প্রতিষ্ঠার এক প্রকার দীর্ঘ্মেয়াদী পরিকল্পনা বলে বিবেচনা করা যেতে পারে, যার লক্ষ্য বাংলাদেশ রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার মৌলিক আদর্শসমূহের সহিত সংগতি রেখে, দুর্নীতি দমন ও সুশাসন প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে রাষ্ট্র ও সমাজের সকল পর্যায়ে নাগরিকের সমঅধিকার, সাম্য, আত্মমর্যাদা ও মৌলিক মানবাধিকার নিশ্চিত করা, সম্পদের সুষম বন্টন ও সুষম উন্নয়ন করা এবং শাসন ব্যবস্থায় স্বচ্ছতা ও জাবাবদিহিতা নিশ্চিত করার মাধ্যমে সুশাসন প্রতিষ্ঠা করা।

এটি একটি সামাজিক আন্দলন যা পরিবার, রাষ্ট্র, সমাজ ও সকল রাষ্ট্রীয় ও অরাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানে চর্চা হবে বলে প্রত্যাশিত এবং বাংলাদেশ সরকার এই দলিলে উল্লেখিত লক্ষ্যসমূহ অর্জনের উদ্দেশ্যে নানারকম প্রাতিষ্ঠানিক ও প্রশাসনিক ব্যবস্থা গ্রহণ করেছে।

সুতরাং, এটা লক্ষ্যণীয় যে জাতীয় শুদ্ধাচার কৌশলপত্রে উল্লেখিত এবং নির্ধারিত আদর্শিক ও নৈতিক লক্ষ্যসমূহ অর্জন করা যেমন একজন সাংবাদিকের পেশাগত লক্ষ্য, তেমনি একজন কর্তব্যনিষ্ঠ ও সচেতন দায়িত্বশীল নাগরিকেরও কর্তব্য।

জাতীয় শুদ্ধাচার কৌশলপত্রের মূল কথা হলো, একটি শোষণ-বঞ্চনা-দূর্নীতিমুক্ত সমাজ প্রতিষ্ঠার পূর্বশর্ত হলো শাসন ব্যবস্থার সকল পর্যায়ে জাবাবদিহিতা এবং সুশাসন প্রতিষ্ঠা। এটি দুর্নীতি এবং অনিয়ম প্রতিরোধে একটি সমন্বিত কৌশলপত্র।

সাংবিধানিকভাবে, নাগরিকের জন্য আইনের শাসন, মৌলিক মানবাধিকার, সমতা, নায়বিচার, রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, ও সামাজিক অধিকার প্রতিষ্ঠা করা যে রাষ্ট্রের লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য, জাতীয় শুদ্ধাচার কৌশলপত্রের নীতিমালা অনুসরণ ও বাস্তবায়নের মাধ্যমে সরকার সেই উদ্দেশ্যসমূহই অর্জন করতে চায়।   

আর এসকল বিষয় অনুসন্ধানী সাংবাদিকতারও মূল উপজীব্য। এক কথায়, উভয়ের লক্ষ্যই সুশাসন প্রতিষ্ঠা। শোষণ-বঞ্চনামুক্ত, স্বচ্ছ ও জবাবদিহিতামূলক শাসন ব্যবস্থা, আইনের শাসন, মৌলিক মানবাধিকার রক্ষা করা, অর্থনৈতিক ও সামাজিক সাম্য নিশ্চিত করা, সুষম উন্নয়ন, ন্যায়বিচার ও দুর্নীতি প্রতিরোধ করা যেমন জাতীয় শুদ্ধাচার কৌশলপত্রের লক্ষ্য, তেমনই এসকল লক্ষ্য অর্জনের এক বিশেষ পেশাদার মাধ্যম হলো অনুসন্ধানী সাংবাদিকতা।

যেহেতু, অনুসন্ধানী সাংবাদিকতায় সম্ভাব্য কোন অনিয়ম বা দূর্নীতি সংগঠিত হয়েছে মর্মে ধারণা পাওয়ার ভিত্তিতে কিংবা আইনে স্বীকৃত কোন নাগরিকের স্বীকৃত  অধিকার লঙ্ঘনের ঘটনা ঘটলে কিংবা মৌলিক মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনা ঘটলে, কিংবা জনস্বার্থ বা জাতীয় স্বার্থবিরোধী ঘটনা ঘটলে, কিংবা সম্ভাব্য কোন দুর্নীতির ঘটনা কিংবা রাষ্ট্রীয় সম্পদ লুন্ঠনের কোন ঘটনা ঘটলে, একজন অনুসন্ধানী সাংবাদিক অনুসন্ধানের মাধ্যমে সম্পূর্ণ ঘটনা উন্মোচন করে অন্তর্নিহিত সত্য উদ্ঘাটন করে তা জনগণের সম্মুখে উপস্থাপন ও প্রকাশ করে। সে বিবেচনায় জাতীয় শুদ্ধাচার কৌশলপত্রে উল্লেখিত লক্ষ্যসমূহ অর্জনের প্রক্রিয়ায় অনুসন্ধানী সাংবাদিকতার কাজ কার্যত একটি সাধারণ লক্ষ্যে সরাসরি পরিপূরকের ভুমিকা পালন করে।  

পেশাদার অনুসন্ধানী সাংবাদিকতার মাধ্যমে কার্যত রাষ্ট্র ও শাসন ব্যবস্থায় জবাবদিহিতা, স্বচ্ছতা ও সুশাসন প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে নাগরিকের স্বীকৃত অধিকার সমূহ এবং জনস্বার্থ সুরক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করা হয়।          

জাতীয় শুদ্ধাচার কৌশলপত্রে নির্ধারিত আদর্শ সমূহ অর্জন, বাস্তবায়ন এবং প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে সরকার কতিপয় সহায়ক আইন-কানুন, বিধি-বিধান ও প্রাতিষ্ঠানিক নীতিমালা, কর্মসূচি প্রণয়ন করেছে এবং তা অনুশীলনের ব্যবস্থা নিয়েছে।

যেমন: দাপ্তরিক বার্ষিক কর্ম-সম্পাদন চুক্তি, তথ্য অধিকার আইন, ভোক্তা অধিকার আইন, জনস্বার্থে তথ্য প্রকাশ সুরক্ষা আইন, অর্থ পাচার নিরোধ আইন, মানব পাচার নিরোধ আইন, অভিযোগ নিষ্পত্তি ব্যবস্থা, একসেস টু ইনফরমেশন কর্মসূচি, সিটিজেন চার্টার, জাতীয় মানবাধিকার কমিশন, তথ্য কমিশন, দূর্নীতি দমন কমিশন, কম্পট্রোলার এন্ড অডিটর জেনারেলের দপ্তর, এবং সংসদীয় স্থায়ী কমিটি ইত্যাদি।

একজন অনুসন্ধানী সাংবাদিক স্বাভাবিক ভাবেই এ সকল সহায়ক আইন-কানুন, বিধি-বিধান ও প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থা ও নীতিমালা ব্যবহারের মাধ্যমে তার অনুসন্ধানী সাংবাদিকতার কাজ সম্পন্ন করে থাকেন যা কার্যত জাতীয় শুদ্ধাচার কৌশলপত্রের লক্ষ্য অর্জনে সঙ্গতিপূর্ণ, সমার্থক ও সমউদ্দেশ্যে পরিচালিত হয়ে থাকে।            

………………………………

  অনুসন্ধানী প্রতিবেদনের স্টোরি/ ধারণা কিভাবে পাবেন

অধিকাংশ খবরের ধারণা বা আইডিয়া জন্মায় সংবাদিকের নিজের আগ্রহের জায়গা থেকে। আগের প্রতিবেদন বা চলমান ঘটনার মধ্যে থাকা প্রশ্ন, কোন বিষয়ে পড়াশুনা করতে গিয়ে বিষয়টি নিয়ে জন্ম হওয়া ধারণা, ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা, কারো সাথে আলাপচারিতা কিংবা কারো কাছ থেকে শোনা কোন মন্তব্য থেকেও অনুসন্ধানী খবরের ধারণা জন্ম নিতে পারে। তবে সব সময় যে এমন ধারণা থেকে ভালো সংবাদ মিলবে, এমনটা নাও হতে পারে। এজন্য ভালো সাংবাদিকের সবচেয়ে কঠিন কাজ হচ্ছে একটি ভালো ধারণা দাড় করানো।

একজন অনুসন্ধানী সাংবাদিকে সব সময় চোখ কান খোলা রাখতে হয়। কাজে যাওয়ার পথে বাস্তার পাশে বন্ধ হয়ে যাওয়া ড্রেনের দিকে যেমন নজর রাখতে হবে, তেমনি হাসপাতালে সেবা নিয়ে গিয়ে কোন নার্সের অসদাচরণ বা অন্যকোনো ঘটনা থেকে প্রতিবেদন বেরিয়ে আসতে পারে। সাধারণভাবে প্রথম নজরে যা দেখা যায় তার চেয়ে বেশি কিছু থাকতে পারে, যা অনুসন্ধানের দাবি রাখে। 

সব সময় সংবাদ হতে পারে এমন ঘটনার নোট রাখুন। নিজের ইন্দ্রিয়ের উপর ভরসা রাখুন, ঘটনাস্থল পরিদর্শন বা লোকজনের সাথে কথা বলার পর হয়ত এমন কিছু পেয়ে যেতে পারেন যা অন্য কেউ হয়ত খেয়াল করেনি। একজন অনুসন্ধানী সাংবাদিক সবচেয়ে ভালো প্রত্যক্ষদর্শী। প্রতিবেদন তৈরির ক্ষেত্রে আপনার অভিজ্ঞতা এবং পর্যবেক্ষণকে অগ্রাধিকার দিন। আপনার অভিজ্ঞতা দিন শেষে কাজে না-ও আসতে পারে, কিন্তু তাই বলে একটু পরীক্ষা করে দেখার প্রাথমিক ধাপ থেকে সরে আসবেন না।

আপনি যদি পেশা হিসেবে সাংবাদিকতাকে গুরুত্ব  দেন, তাহলে পড়াশুনা করাটা আপনার ইচ্ছার ব্যাপার না। এটা আপনার পেশাগত দায়িত্ব। এটি আপনার লেখার দক্ষতা বাড়ায়। আপনি নানা বই-প্রবন্ধ থেকে বুঝতে পারেন, কিভাবে নানা পদ্ধতি ও ব্যবস্থা কাজ করে। এটি বুঝতে পারলে আপনি কোনটা ভালো আর কোনটা খারাপ তা নির্ধারণ করতে পারবেন। একজন দক্ষ অনুসন্ধানী সাংবাদিক তার কাছে যত স্বাভাবিকভাবে যে সকল তথ্য আসে, সেইসবের গুরুত্ব দেবার চেয়ে তার জ্ঞানের পরিধি বাড়াতে নতুন নতুন তথ্য অনুসন্ধান করে থাকেন।

ইনভেস্টেটিগেটিভ রিপোটার্স এন্ড এডিটরসের (আইআরই) সাবেক নির্বাহী পরিচালক হিউস্টন আইআরইয়ের ইনভেস্টেটিগেটিভ রিপোটিং হ্যান্ডবুকে পাঠকদের স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন যে, অনুসন্ধানী প্রতিবেদনের অনেক বীজ বহন করেন স্থানীয় সংবাদপত্রগুলো। এসব পত্রিকায় প্রকাশিত নাম পরিবর্তন, ক্রয়-বিক্রয়, দরপত্রেরমত আইনি নোটিশে (বিজ্ঞাপন) লুকিয়ে থাকে ভালো সংবাদ কাহিনী। আপনার কাজ হচ্ছে সতর্ক থাকা, কি হচ্ছে, কেন হচ্ছে তা খুজে বের করা। সাংবাদিকেরা যে কাজটি খুব কমই করেন, তা হলো প্রকাশিত খবরের ঘটনাপ্রবাহে নজর বা ফলোআপ। পাঠক জরিপ ও ফোকাস গ্রুপ থেকে দেখা যায় পাঠক ফলোআপ নিউজ পড়তে বেশি পছন্দ করে। তারা জানতে চান, ঘটনার পরবর্তী সময় কি ঘটল। কেন এটা ঘটলো? বিশেষভাবে সেই সব সংবাদের দিকে নজর দিন যেখানে ঘটনাটি ঘটেছে, সেই প্রশ্ন এড়িয়ে যাওয়া হয়েছে কিনা বা কোনো ঘটনা শুধু একটি আঙ্গিক থেকে তুলে আনা হয়েছে কিনা। অনেক পড়াশুনা করলে আপনি নীরবে আড়ালে চলে যাওয়া বিভিন্ন ঘটনার দিকেও নজর দিতে পারবেন।

এছাড়া আপনি ইন্টারনেট থেকে বিভিন্ন নিউজ সাইট, ফেসবুক, টুইটারেরমত সামাজিক নেটওয়ার্ক ব্যবহার করতে পারেন। এখানে বিভিন্ন ঘটনার পক্ষে বিপক্ষে নানা ধরনের মতমত পাওয়া যায়। সেখান থেকেও গুরুত্বপূর্ণ সংবাদ পাওয়া যেতে পারে।

প্রতিবেদনের ধারণা পরখ করে দেখা:

কোনো প্রতিবেদনের আইডিয়া বা ধারণা আপনি যেভাবেই পেয়ে থাকুন না কেন, তার পরবর্তী পদক্ষেপ হচ্ছে; এটি আপনাকে কোথায় নিয়ে যাবে তা পরখ করে দেখা। সম্ভাব্য পক্ষপাত এবং বাঁধা বিপত্তি সস্পর্কেও সচেতন থাকা।  

গোপন তথ্যের সুত্র মূল্যায়ন:

অনুসন্ধানী সাংবাদিকতার অনেক প্রতিবেদনের সূচনা হতে পারে গোপন সোর্স বা সূত্র থেকে পাওয়া তথ্য থেকে। কিন্তু এসব তথ্য যেমনটি ধারণা করা হয় তেমনটি নাও হতে পারে। এমনকি অসত্য বা কাউকে ফাঁসানোর জন্যও হতে পারে। এগুলো আংশিক সত্য হতে পারে, যাতে করে অন্য কারো উদ্দেশ্য হাসিল হয়। এই ক্ষেত্রে প্রথমেই যে কাজটি অবশ্যই করতে হবে তা হলো, আপনাকে যে গোপন তথ্য দেওয়া হয়েছে তার সস্পর্কে কয়েকটি প্রশ্নের উত্তর খোঁজা। গোপন সূত্রে পাওয়া তথ্য নিয়ে কাজ করার সময় প্রথমে যে প্রশ্ন করা উচিত:

  • গোপন সূত্র থেকে তথ্য না পেলেও আমি কি বিষয়টি নিয়ে লিখতাম?
  • বিষয়টি কি এমন, যা সস্পর্কে আমার আগ্রহ রয়েছে?
  • যে সত্য প্রকাশিত হয়েছে তাতে কি সত্যিই কোনো জনস্বার্থ আছে?

এই তিনটি প্রশ্নের ক্ষেত্রেই আপনার উত্তর যদি হ্যা হয়, তাহলে আপনি কাজটি শুরু করতে পারেন।