অনুসন্ধানী সাংবাদিকতা – ২য় পর্ব

 বিষয় .: অনুসন্ধানী প্রতিবেদন তৈরির ধাপসমূহ

সাধারণভাবে, অনুসন্ধানী সাংবাদিকতায় কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্য অর্জন করতে কতিপয় পদ্ধতিগত (systematic) ধাপ অনুসরণ করতে হয়। যেমনঃ (ক) পর্যবেক্ষণ/বিশ্বস্ত সূত্রের তথ্য/ঘটনার ফলো-আপ ইত্যাদি। অনুসন্ধানী সাংবাদিক জনস্বার্থ পরিপন্থী কোনো ঘটনা বা বিষয় বা আপাত অনিয়ম লক্ষ্য করলে তা পর্যবেক্ষণ করে, প্রশ্ন করে এবং সম্ভাব্য অনুসন্ধানের একটি ধারণা বা ক্ষেত্র অনুমান ও প্রস্তত করে।

যেমনঃ বহুল আলোচিত উন্নয়ন প্রকল্প পদ্মা সেতু, দেশের প্রথম মেট্রোরেল, পায়রা সমূদ্রবন্দর, মাতারবাড়ি বিদ্যুৎ প্রকল্প, মাতারবাড়ি গভীর সমুদ্রবন্দর, রূপপূর আনবিক শক্তি বিদ্যুৎ প্রকল্প, কর্নফুলী টানেল প্রকল্প ইত্যাদি জনগণের কত অর্থ ব্যায়ে নির্মিত হচ্ছে? প্রতিবেশী ভারত, এশিয়ার আঞ্চলিক এবং আন্তর্জাতিক মানদণ্ডে এই ব্যয় কি সঙ্গতিপূর্ণ এবং যুক্তিসংগত?  যদি সঙ্গতিপূর্ণ না হয়, তবে অতিরিক্ত ব্যয়ের কারণ কি এবং তাতে কে কিভাবে লাভবান হয়েছে? জনগনের কষ্টার্জিত অর্থের কি অপচয় হয়েছে? জনগণের অর্থের অপচয়ের যথার্থতা/Justification কি? কিভাবে তা নিরূপণ করা হয়েছে? কে নিরুপন করেছে? কি পদ্ধতিতে নিরূপণ করেছে? এসকল প্রকল্প গ্রহণ ও বাস্তবায়নে প্রচলিত আইন ও সরকারি ক্রয় নীতিমালা যথাযথভাবে অনুসরণ করা হয়েছে কিনা, ঠিকাদার এবং বাস্তবায়নকারী কর্তৃপক্ষের প্রয়োজনীয় যোগ্যতা আছে কিনা, কারিগরি যোগ্যতা আছে কিনা, যথাযথভাবে প্রকল্পের সম্ভাব্যতা যাচাই হয়েছে কিনা, পরিবেশ আইনের বিধান মানা হয়েছে কিনা, একটি প্রকল্প  বাস্তবায়নে কি পরিমাণ মানবিক, সামাজিক এবং পরিবেশগত/প্রতিবেশগত মূল্য দিতে হবে এবং সর্বোপরি, যে সকল লক্ষ্যে প্রকল্পটি গ্রহণ করা হয়েছে, বাস্তবায়িত হলে প্রকল্পটি কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্য সমূহ অর্জন করতে সক্ষম কিনা, এসব সাধারণ প্রশ্নের জবাব অস্পষ্ট হলে বা জবাব না পাওয়া গেলে এক বা একাধিক অনুসন্ধানী প্রতিবেদনের সূত্রপাত হতে পারে। এসকল প্রশ্নের আলোকে যে কোন ঘটনা বা বিষয়কেই অনুসন্ধানী সাংবাদিকতার কাজে বিবেচনা করা যেতে পারে।

যেমনঃ করোনা মহামারিকালে রাষ্ট্রের কোষাগার থেকে কত অর্থ অনুদান এবং প্রণোদনার লক্ষ্যে বরাদ্দ করা হয়েছে এবং তা যথাযথভাবে ব্যয় হয়েছে কিনা। চিকিৎসা সামগ্রী ক্রয়ে অর্থ যথাযথভাবে প্রচলিত আইন ও ক্রয় বিধিমালা অনুসরণে ব্যয় হয়েছে কিনা এবং ক্রয়কৃত সামগ্রী জনগণের কতটুকু উপকারে এসেছে বা কাজে লেগেছে ইত্যাদি।

প্রতিদিনের সংবাদ অনুসরণ এবং এমনকি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে থেকেও একটি অনুসন্ধানী সাংবাদিকতার কাজের ধারণা নির্মাণের সূত্রপাত হতে পারে এবং এর উপাদান ও প্রাথমিক রসদ সংগ্রহ করা যেতে পারে। কাজেই, একজন অনুসন্ধানী সাংবাদিকের চোখ-কান খোলা রেখে গভীর পর্যবেক্ষণের দৃষ্টি থাকা অত্যন্ত জরুরি।

এই পর্যায়ে নিচের প্রশ্নগুলো বিবেচনায় নিতে হবে;

কি ঘটছে, কেন আপনার পাঠক বিষয়টিতে আগ্রহী হবে?

সংগঠিত অনিয়মের সাথে কারা সম্পৃক্ত? কিভাবে তারা অনিয়ম করেছে? এর ফলাফল কি হয়েছে?

কী ভুল/অনিয়ম হয়েছে? কীভাবে এই ভুল/অনিয়ম হয়েছে? এর পরিণতি কি?

খবরটি প্রকাশিত হলে কারা সুবিধা পাবেন এবং কারা অসুবিধায় পড়বেন? সংবাদটি প্রকাশিত হলে সমাজের আচরণ বা মূল্যবোধ নিয়ে কি কোনো বিতর্ক তৈরি হবে? বিশেষ এই খবরটিতে কি পদ্ধতি বা প্রক্রিয়ার ত্রুটিরকথা উঠে আসবে?               

পরিকল্পনা তৈরি:

একজন অনুসন্ধানী সাংবাদিক প্রকৃত সত্য উদঘাটনের ভিত্তিতে অনুসন্ধানী প্রতিবেদন তৈরির লক্ষ্যে একটি বিশদ, বিস্তারিত ও ধারাবাহিক পরিকল্পনা গ্রহণ করেন।

বাজেট প্রস্তুত: অনুসন্ধানী বিষয়ের পরিকল্পনাটি একটি প্রকল্পের আদলে তার নিয়োগকারী প্রতিষ্ঠানের নিকট অথবা সম্ভাব্য অর্থ-সহায়তাকারী সংগঠনের নিকট অথবা তিনি স্বনির্ভর হলে তার নিজের জন্য একটি প্রস্তাব আকারে সম্ভাব্য বাজেট উপস্থাপন করবেন।

গবেষণা, গবেষণা এবং গবেষণা: নির্ধারিত বিষয়ের সকল দিকের বিশদ পাঠ ও  আলোকপাত করা এবং প্রস্তাবিত প্রতিবেদনের সম্ভাব্য সকল দিক তুলে ধরার লক্ষ্যে একজন অনুসন্ধানী সাংবাদিক ধারাবাহিক গবেষণা করবেন। ঘটনার অন্তরালের ঘটনা এবং চূড়ান্ত ও প্রকৃত সত্য উদঘাটনে সংশ্লিষ্ট ব্যাক্তিদের আনুষ্ঠানিক এবং অনানুষ্ঠানিক (অফ-রেকর্ড) বিশদ বক্তব্য, মন্তব্য ও আলোচনা লিপিবদ্ধ করবেন।

গ্লোবাল ইনভেষ্টিগেটিভ জার্নালিজম নেটওয়ার্কের মতে অনুসন্ধানী সাংবাদিকতায় সুনির্দিষ্ট কিছু প্রণালী অনুসরণ করতে হয়। এটি এমন এক ধরনের শিল্প, যা মুঠোয় আনতে বছরের পর বছর চেষ্টা করে যেতে হয়। অনুসন্ধানী সাংবাদিকতায় শ্রেষ্ঠ পুরস্কার পাওয়া প্রতিবেদনগুলো দেখলেই বোঝা যায়, কত ব্যাপক গবেষণা আর কঠোর শ্রম এর পেছনে ব্যয় করা হয়েছে। কঠিন একাগ্রতা, আর বিষয়ের গভীরে যাওয়ার নিষ্ঠা ছিল বলেই এই স্টোরিগুলোতে জনগণের সম্পদ লুট, পরিবেশ বিপর্যয়, ক্ষমতার অপব্যবহার, স্বাস্থ্যসেবার করুণ দশা ইত্যাদির চিত্র এত জোরালোভাবে উঠে এসেছে।

সাক্ষাতকার গ্রহণ: সাক্ষাতকার গ্রহণ করা একজন অনুসন্ধানী সাংবাদিকের জন্য একটি অতি গুরুত্বপূর্ণ কাজ। প্রকৃত ও চূড়ান্ত সত্যে উপনীত হওয়ার লক্ষ্যে, ঘটনার অন্তরালের ঘটনাসমুহের সূত্র ও সাদৃশ্য খুজে বের করে তা অনুসরণপূর্বক তিনি ঘটনাবলীর একটি অন্তযোগ ও আন্তযোগ বা Pattern নির্ধারণ করবেন। এরই ধারাবাহিকতায়, উন্মোচিত সত্য প্রমাণ ও প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে প্রকাশিত বা উন্মুক্ত তথ্যের পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট বিষয়ের সাক্ষতকার গ্রহণের প্রশ্ন তৈরিসহ প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি গ্রহণ।

নথি সংরক্ষণ র্যালোচনা: সংশ্লিষ্ট বিষয়ে দাপ্তরিক নথিপত্র/ ডকুমেন্ট/রেকর্ড-পত্রের অনুলিপি সংগ্রহ করবেন যা সত্যের অকাট্য প্রমাণ হিসাবেও গুরুত্বপূর্ণ। অনেক ক্ষেত্রে প্রকাশিত নথি-পত্রে প্রাপ্ত তথ্যসমূহ পরস্পর তুলনা, বিশ্লেষণ এবং সংযোগ সাধনের মাধ্যমেও অনুসন্ধানের কাজ অনেকটাই অগ্রসর করে নেয়া সম্ভব। তবে, প্রাপ্ত তথ্যসমূহ ক্রমাগত যাচাইয়ের মাধ্যমে তথ্যের সঠিকতা প্রমাণ করা অতি গুরুত্বপূর্ণ।

এ সকল দীর্ঘ অনুশীলন শেষে অনুসন্ধানকৃত ঘটনা বা বিষয়ের সত্যটি আবিষ্কারের ক্ষেত্র সম্পূর্ণ প্রস্তুত হলে, পরে সুচিন্তিত, যথাযথ, প্রাসঙ্গিক এবং সুনির্দিষ্ট প্রশ্ন প্রস্তত করে যথাযথ ব্যক্তি, প্রতিষ্ঠান ও কর্তৃপক্ষের নিকট উপস্থাপন করে সংঘঠিত সম্ভাব্য অনিয়ম, দূর্নীতি এবং বৃহত্তর জনস্বার্থ লঙ্ঘনের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট দায়িত্বশীলদের (Those, who are responsible) যথার্থ জবাব সংগ্রহ করতে হবে।এই সমগ্র বিষয়াদি নির্ধারণ এবং পরিকল্পনা প্রণয়নে একজন সাংবাদিক অন্য একজন জ্যেষ্ঠ, অভিজ্ঞ এবং অনুসন্ধানী সাংবাদিক সহকর্মীর সহায়তা ও নির্দশনা / Guidance  নিতে পারেন।

এই দীর্ঘ অনুশীলন এবং গবেষণা পরিচালনার প্রতিটি ধাপে সংগৃহীত তথ্য-উপাত্তসমূহ সর্বোচ্চ সতর্কতার সাথে সুরক্ষার ব্যবস্থা নিতে হবে। কেননা, অনুসন্ধান চলাকালীন মাঝপথে কোনো গুরুত্বপূর্ণ তথ্য ফাঁস হয়ে গেলে সমগ্র অনুসন্ধানী প্রতিবেদনের কাজটি এবং সাংবাদিক নিজেও হুমকির মুখে পড়তে পারেন এবং অনুসন্ধানের পুরো কাজটিই ভেস্তে যেতে পারে।

প্রতিবেদন লেখা:

সবকটি ধাপ সম্পন্ন করার পর সংগৃহীত তথ্য, নোট, নথি-পত্র ও সাক্ষাতকার সমন্বয়ে প্রতিবেদনটি লেখা শুরু করা এবং প্রকাশের জন্য উপাস্থাপন করা। তবে, লেখার আগে সাংবাদিককে পরিষ্কার করে নিতে হবে তার উদ্ঘাটিত সত্যটি কি এবং তিনি কি বলতে চান, তা সহজে এবং সাবলীলভাবে লিখতে হলে চিন্তার স্বচ্ছতা এবং সাবলীলতা অতি জরুরি। একটি অনুসন্ধানী প্রতিবেদন প্রকাশের পর আরো একাধিক ফলো-আপ বা অনুগামী প্রতিবেদনের ক্ষেত্র অবারিত হতে পারে এবং সে সকল প্রতিবেদন করার পরিকল্পনা গ্রহণ করাও একজন অনুসন্ধানী সাংবাদিকের জন্য জরুরি কাজ।       

কোনো প্রতিবেদনের মাধ্যমে পাঠকের মনে প্রভাব ফেলতে চাইলে আপনাকে এর মূল বিষয় নিয়ে চিন্তা করতে হবে এবং সবচেয়ে শক্তিশালী চিত্রটি তুলে ধরতে হবে। পাঠকের মনোসংযোগ আকৃষ্ট করার বিষয়ে জ্যেষ্ঠ মার্কিন সাংবাদিক স্টিফেন ফ্রাস্কলিনের পরামর্শ হলো, শুরুতেই অত্যন্ত ব্যক্তিগত বিষয়কে প্রধান্য দিন যাতে একটি জোরালো সূচনার ছবি পাওয়া যায়। প্রথমেই জানানো উচিত শুধু ন্যূনতম মৌলিক তথ্য, যার বিস্তারিত আপনি পরে খোলসা করবেন। তবে যা খুজে পেয়েছেন তা সততার সাথে লেখাও জরুরি। প্রতিবেদনের সাথে যায় না এমন বিষয় দেখানোর চেষ্টা করবেন না বা ঘটনাকে চাঞ্চল্যকর প্রমাণের চেষ্টা করবেন না। পাঠকের বিশ্বাস অর্জনের বিষয়টি সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন। তাই আপাতদৃষ্টিতে অসত্য বলে মনে হয়, এমন বর্ণনা দিয়ে শুরু করলে আপনার পুরো উদ্যোগই ক্ষতিগ্রস্থ হতে পারে।

তথ্যগুলো দেওয়ার পর আপনার অনুসন্ধানের উদঘাটনগুলো জানিয়ে সেগুলোর প্রমাণ তুলে ধরুন। শব্দচয়নে অসর্কতা বা তথ্যপ্রমাণের সংযুক্তিতে দুর্বলতা রেখে প্রতিবেদনটি খেলো বানিয়ে ফেলবেন না।

মনে রাখার মতো কয়েকটি বিষয়:

হতে হবে নির্ভুল;

বর্ণনা উদাহরণ:

আপনার পাঠকের জন্য পেশাজীবিদের বিশেষ ভাষা ও জটিল বিশেষণের ব্যাখ্যা দিতে হবে এবং প্রতিবেদন জুড়ে এই ব্যাখ্যা বজায় রাখতে হবে। এছাড়া উদাহরণের মাধ্যমে এই সব জটিল শব্দকে বোধগম্য করতে হবে। 

অপ্রমাণি বিষয়ে সরলীকরণ:

সর্বাধিক’ ‘অনেক’ ‘কিছু’ বা ‘কয়েকটি’- এমন শব্দগুলোর পার্থক্য ও অর্থ বুঝতে হবে। যথাযথভাবে শব্দগুলোর মধ্যে পার্থক্য করতে হবে। ‘সর্বাধিক ও ‘অনেক’ -এর মধ্যে পার্থক্য করার ক্ষেত্রে অতি সাবধানতা অবলম্বন করতে হবে এবং ‘সবাই’ বা ‘কেউ না’ এর মধ্যে পার্থক্য করার ক্ষেত্রে আরও সাবধানী হতে হবে। কোনো কিছু কি ‘একমাত্র কারণ’ নাকি ‘অনেকগুলো কারণের একটি’? এটি কি ‘সব সময়ই’ নাকি ‘প্রায়শই’? বাস্তব উদাহরণ ও নাম উল্লেখ করা ব্যক্তিদের উদ্ধৃতি দিয়ে বিষয়টিকে সহজকরে বোঝাতে হবে।

যুক্তিকে শক্তিশালী করা:

সাবধনতার সঙ্গে সুনির্দিষ্ট বিবরণ দিয়ে সব বক্তব্য-বিবৃতির যুক্তিগুলো তুলে ধরুন। যখন আপনার একটি ধারণা বা আইডিয়াকে সমালোচনা করার কথা, তখন কোন ব্যক্তিকে আক্রমণ করবেন না। তথ্য ও যুক্তি দিয়ে আলোচনার মধ্যেই থাকুন। কোন সুবিধা নেওয়ার বিষয় সিদ্ধান্তগ্রহণের পক্ষে বা বিপক্ষে প্রভাব ফেলছে কি না, তা পাঠককেই ঠিক করে নিতে দিন। কখনও কখনও তথ্যপ্রমাণগুলোই আপনার হয়ে কথা বলবে।

প্রমানক হিসেবে কর্তৃপক্ষের উদ্ধৃতি:

কোনো বিষয়ে ভালো বা মন্দের তালিকা করুন এবং সেগুলো ব্যবহারে ভারসাম্য বজায় রাখুন। কর্তৃপক্ষের নেওয়া পদক্ষেপের পেছনের কারণগুলোতে মনোযোগ দেওয়া গুরুত্বপূর্ণ। কেউ কিছু বললে তা কেন বলছে, সেটা বোঝা দরকার। ঘটনার পটভূমির জন্য একটি উৎস নয়, বরং প্রাসঙ্গিক একাধিক ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে কথা বলুন, গবেষণা করুন।

জিজ্ঞসা করা, তাহলে কী:

আপনার হাইপোথিসিসের সাথে কোন তথ্য প্রাসঙ্গিক কি না, তা স্মরণ করিয়ে দেবার একটি ভালো উপায় নিজে নিজেকে এই প্রশ্ন জিজ্ঞেস করা, তাহলে কী।

অনুচ্ছেদের পর অনুচ্ছেদ সাজিয়ে লেখা:

আপনার প্রতিবেদনটি চিন্তা করুন বেশ কয়েকটি পর্বের সমষ্টি হিসেবে এবং প্রতিটি পর্বে থাকবে বেশ কয়েকটি অনুচ্ছেদ। এই পর্বগুলোতে আপনার অনুসন্ধানের একেকটি দিক উঠে আসবে এবং সেগুলো সস্পর্কে বিস্তারিত বর্ণনা থাকবে। একটি বৃহৎ দৃশ্যকে কয়েকটি ভাগে বিভক্ত করে উপস্থাপন করলে পাঠকের বুঝতে সুবিধা হবে। প্রতিটি অনুচ্ছেদে যে বিষয় গুলো থাকা উচিৎ:

(১) তথ্যপ্রমান (বিস্তারিত, বিবৃতি,যুক্তি, সংখ্যা) ২. সংজ্ঞা বা ব্যাখ্যা ৩. প্রসঙ্গ, ইতিহাস, তুলনা বা পার্থক্য ৪. কারণ কিংবা প্রভাব ৫. পক্ষে ও বিপক্ষে যুক্তি ৬. ফলাফল নিয়ে বিশ্লেষণ বা পরামর্শ।

সস্প্রচারের জন্য কিভাবে লিখবেন;

সব সস্প্রচার প্রতিবেদনেই ভিডিও বা অডিও উদ্ধৃতি থাকে। একই ছবি ও উদ্ধৃতি পটভূমি ভেদে অনেক ধরনের গল্প বলতে পারে। পারিপার্শ্বিক ভাষ্যের লক্ষ্য হলে আপনার গল্পটি শ্রোতাদের বুঝতে পারার বিষয়টি নিশ্চিত করা। 

একটি বুদ্ধিদীপ্ত লেখা খুবই খুবই সাধারণ কোন ছবি বা গতানুগতিক উদ্ধৃতিকে নতুন আলোকে দর্শকদের কাছে হাজির করতে পারে। রেডিওতে ধারণকৃত বক্তব্যের আলোকে স্কিপ্ট লেখা হলে সেটি হয় সবচেয়ে জোরালো। কিন্তু টেলিভিশনের ক্ষেত্রে প্রভাবের ৮৫ শাতংশ নির্ভর করে ছবির ওপর। বিরক্তিকর ছবি ও উদ্ধৃতির সমস্যা ভালো লেখায়ও দুর হয় না। এর মাধ্যমে দর্শক ‘ধরা’ যায় না এবং তারা মুখ ফিরিয়ে নেন। উভয় ক্ষেত্রেই ছবি বা রেকর্ড করা উদ্ধৃতিকে কেন্দ্র করে আপনার গল্প সাজাতে হবে। এই বিষয়কে বলা হয় ‘কানের জন্য লেখা’, ‘ছবির জন্য লেখা’ অথবা ‘শব্দের জন্য লেখা”।

ক্যামেরায় ধারণ করেছেন এমন কিছু ঘটনাস্থলের খবর বা ‘গ্রাউন্ড রিপোর্ট’ দিয়ে আপনি শুরু করুন। এরপর আপনার নিজস্ব মন্তব্যে সাবধানে নির্বাচিত শব্দ ব্যবহার করুন এবং পরের ধাপে অগ্রসর হোন।;

১. রিপোর্টের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিকগুলোতে জোর দিন।

২. ছবি ও উদ্ধৃতি  যেখানে শুধু কয়েকটি দিক তুলে ধরেছে, সে রকম অবস্থায় ভারসাম্য আনার চেষ্টা করুন।

৩. যে বিষয়গুলোতে আপনি দর্শকদের মনোযোগী করতে চান, সেগুলো নির্বাচন করে তার উপর জোর দিন।

৪.বিভিন্ন চিত্র ও উদ্ধৃতিগুলো সংযুক্ত করুন এবং সময়ের সঙ্গে এগুলো কিভাবে বদলেছে, তা ব্যাখ্যা করুন।

৫. চিত্র ও উদ্ধৃতিগুলো প্রাসঙ্গিক করুন্

৬. চিত্র বা উদ্ধৃতি গুলোর মাধ্যমে যে ব্যাখ্যা বা অর্থ বোঝাতে চান, সেগুলো যোগ করুন (তবে তথ্য বিকৃত করবেন না কিংবা বাদ দেবেন না!)।

উপস্থাপক বা রিপোর্টাররা এই সব বিষয় মেনে চলতে পারেন এবং এগুলো মানা উচিত। তবে এর মানে এই নয় যে, তিনি সবসময় দর্শক বা সংবাদের মাঝখানে ফিল্টারের মতো থাকবেন বা প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করবেন। আপনার রিপোর্টে কোন ব্যক্তির বক্তব্য প্রাসঙ্গিক হলে স্টেশনের নিজস্ব কণ্ঠ ব্যবহার বা নিজস্ব ভাষায় প্রচারের চেয়ে সেই ব্যক্তির কণ্ঠকেই সব  সময় প্রধান্য দেওয়া উচিত।

ছাপা প্রকাশনা এবং সম্প্রচারমাধ্যমের পার্থক্য

ছাপা প্রকাশনাসম্প্রচারমাধ্যম
পত্রিকায় পাঠকেরা যখন কিছু পড়েন, সেটি না বুঝলে তিনি পেছনে ফিরে গিয়ে আবার পড়তে পারেন।সম্প্রচারিত সংবাদগুলো একবারই মাত্র দর্শকের সামনে দিয়ে চলে যায়। এ কারণে দর্শকদের মধ্যে বিস্তারিত মনে রাখার চেয়ে কিছুটা ধারণা পাওয়ার সম্ভবনাই বেশি থাকে। সস্প্রচারিত সংবাদে পুরো প্যাকেজের ধরন সে কারণেই বেশ গুরুত্বপূর্ণ।
পড়ার সময় ভূলগুলো চোখে পড়ে এবং পাতাতেই থেকে যায়।সম্প্রচারমাধ্যম দর্শকেরা প্রথমবারেই ভুলটি ধরতে পারেন অথবা কখনোই তার ভুল ধরতে পারে না।
পাতা ধরে পড়ার সুবিধার্থে সেখানে শিরোনাম, ক্যাপশন ও অনুচ্ছেদের মতো চিহ্নগুলো স্পষ্টভাবেই থাকে।সম্প্রচারমাধ্যমে মাঝামাঝি দেখতে এসে সেখানে কী চলছে, তা বোঝা নতুন দর্শকের জন্য বেশ কষ্টকর।
পাঠকেরা পড়া বন্ধ রেখে চলে যেতে পারেন এবং অন্য কিছু করতে পারেন। আবার যখন তারা ফিরে আসবেন, কোন কিছু না হারিয়ে যেখানে পড়া থামিয়েছিলেন, সেখানে থেকেই আবার শুরু করতে পারেন।রেকর্ড করা না হলে বা ইন্টারনেটে না পাওয়া গেলে সম্প্রচারের ক্ষেত্রে দেখা থামিয়ে দিয়ে অন্য কাজ করা সম্ভব নয়।
ছবি ও মাল্টিমিডিয়া কনটেন্ট প্রতিবেদনের বিশ্বাসযোগ্যতা বাড়াতে পারে। অনলাইন প্রকাশনা তাদের আস্থা বাড়াতে এই সুবিধা কাজে লাগাতে পারে।সস্প্রচারিত সংবাদে বক্তব্যের পক্ষে দর্শকদের আরও বেশি প্রমাণ দেওয়া হয় (উদাহরণ: শব্দ, ছবি) যা একে আরও বেশি বিশ্বাসযোগ্য করে (এমনও শোনা যায় ‘এটি অবশ্যই সত্য: আমি টিভিতে দেখেছি’)। একই কারণে, এটি সত্যকে আরও জোরালোভাবে বিকৃত করতে পারে।
পড়তে বেশি সময় লাগলেও লিখিত রিপোর্ট থেকে পাঠক অনেক বেশি বিস্তারিত তথ্য পেতে পারেন।সস্প্রচারিত সংবাদের জন্য উচ্চ শিক্ষিত হওয়ার প্রয়োজন নেই। তবে বৈচিত্রময়, দ্রুত চলা, প্যাকেজ বোঝার জন্য ভালো সাধারণ জ্ঞান প্রয়োজন।

ব্রডকাস্ট ব্যতীত সস্প্রচারিত সংবাদ শুধু সময়ের সঙ্গে সঙ্গেই ঘটে। এখানে পত্রিকার মতো বস্তুগত কোন বিষয় থাকে না।

এসব কারণে সস্প্রচারিত সংবাদ এবং দর্শকেদের এগুলো গ্রহণ করার ধরন থেকে বোঝ যায়, সস্প্রচারের জন্য যে ভাষায় আগাতে হয়, সেটি প্রিন্ট মিডিয়াতে ব্যবহারের ভাষা থেকে ভিন্ন। অবশ্য  মাধ্যম যা-ই হোক না কেন, সংক্ষিপ্ত সময় ও জায়গার মধ্যে আপনাকে উল্লেখযোগ্যসংখ্যক তথ্য অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। তাই ‘অতি গুরুত্বপূর্ণ বা আকর্ষনীয় তথ্য’ অথবা ধারণা খুজে নিন, যা দ্রুততম সময়ে আপনার দর্শকদের ধরতে পারবে। আর এটি ব্যবহার করুন আপনার অনুসন্ধানী প্যাকেজের শুরুতেই।