অনুসন্ধানী সাংবাদিকতা

মডিউল- ৩ : অনুসন্ধানী সাংবাদিকতা

ভূমিকা ও উদ্দেশ্য: 

এই প্রশিক্ষণের তৃতীয় এবং শেষ মডিউল হচ্ছে অনুসন্ধানী সাংবাদিকতা। পূর্বের দুইটি মডিউলে রাষ্ট্রীয় কাজে স্বচ্ছতা এবং জবাবদিহীতা নিশ্চত করতে জাতীয় শুদ্ধাচার কৌশল এবং তথ্য অধিকার আইনসহ গুরুত্বপূর্ণ যে সকল আইন, বিধি, নীতিমালা এবং কৌশলপত্র প্রণয়ন করা হয়েছে সেই সকল বিষয় রাষ্ট্রের সাধারণ নাগরিকগণসহ বিভিন্ন পেশাজীবিরা কিভাবে কাজে লাগাতে পারেন সেই বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা করা হয়েছে। এই মডিউলে একজন সাংবাদিক অনুসন্ধানী সাংবাদিকতার রীতিনীতি, লক্ষ্য, উদ্দেশ্য, সাংবাদিকতা এবং অনুসন্ধানী সাংবাদিকতা পার্থক্য, অনুসন্ধানী সাংবাদিকতা জন্য তথ্য উপাত্ত সংগহের পদ্ধতি, অনুসন্ধানী প্রতিদেন তৈরী, তথ্য সুরক্ষা, সাক্ষাতকার গ্রহণ, প্রশ্ন তৈরী এবং প্রতিবেদন লেখা ছাড়াও অনুসন্ধানী সাংবাদিকতায় জাতীয় শুদ্ধাচর কৌশলসহ ব্যবহৃত টুলস নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করা হয়েছে।  লক্ষ হলো জনস্বার্থে এমন কিছু উন্মুচোন করা, যা ইচ্ছে করে বা অনিচ্ছায় গোপন রাখা হয়েছিল।

 বিষয় ৩:১: সাংবাদিকতা ও অনুসন্ধানী সাংবাদিকতা 

সাধারণভাবে সাংবাদিকতার কাজ দুইভাবে সম্পন্ন হয়ে থাকে। সাদামাটা এবং প্রাথমিকভাবে প্রাপ্ত তথ্যের ভিত্তিতে প্রস্তত করা সংবাদ প্রতিবেদন দৈনন্দিন সাংবাদিকতা। এর ভিত্তি নিত্যদিন ঘটে যাওয়া ঘটনাবলী। এর প্রকৃতি অগভীর ও সাধারণ এবং এর গল্পটি সাধারণত একমাত্রিক। এটি superficial বা সাদামাটা উপরিতলের গল্প। অন্যদিকে, অনুসন্ধানী সাংবাদিকতার মাধ্যমে যে সংবাদ প্রতিবেদন নির্মান করা হয় তা একটি নির্দিষ্ট ঘটনা বা বিষয়ে গভীর অনুসন্ধান এবং এর পটভূমি বিস্তারিত গবেষণা ও পাঠের ভিত্তিতে গড়ে ওঠে এবং রচিত হয়।

দৈনন্দিন সংবাদিকতা:

নিত্যদিনের বা  দৈনন্দিন ঘটে যাওয়া যেকোনো ঘটনাবলি কিংবা সরকারী-বেসরকারী দাপ্তরিক বা কর্তৃপক্ষের প্রকাশিত তথ্যের ভিত্তিতে, কিংবা সভা-সমাবেশ, সেমিনার-ওয়ার্শকপ, সংবাদ সম্মেলন, গবেষণা বা কোনো জরিপের প্রকাশিত ফলাফল, দূর্ঘটনা, প্রেস রিলিজ, প্রেসনোট, হ্যান্ডআউট, ব্রিফিং, ঘোষণা, নোটিস, দাবী-দাওয়া, প্রতিবাদ, আলোচনা, উদ্বোধন এবং সাধারণ বক্তব্য,  ইত্যাদির ভিত্তিতে প্রণীত সংবাদ প্রতিবেদন সাধারন সাংবাদিকতা, সাধারনভাবে যার ধরণ ও প্রকৃতি অগভীর, ভাসা ভাসা এবং আটপৌরে।

অনুসন্ধানী সাংবাদিকতা:

একটি নির্দিষ্ট ঘটনা বা বিষয়ের অন্তর্নিহিত সত্যানুসন্ধান, অনুসরণ, আবিষ্কার, উদঘাটন এবং উপস্থাপন অনুসন্ধানী সাংবাদিকতা। অনুসন্ধানী সাংবাদিকতায় ঘটনা বা বিষয়ের পটভূমি, কার্যক্রম, ধারাবাহিকতা এবং কালানুক্রম পর্যালোচনা ও পাঠ করা হয় এবং অনুসন্ধানের অংশহিসাবে নিরলস অনুসরণ করা হয়। অনুসন্ধানী সাংবাদিকতার প্রক্রিয়ায় একজন সাংবাদিক তার পেশাগত মানদন্ড, পদ্ধতি, প্রক্রিয়া এবং নৈতিকতা অক্ষুন্ন রেখে সত্য অনুসন্ধান, উন্মোচন, উদ্ঘাটন এবং বৃহত্তর জনস্বার্থে লব্ধ সত্য প্রকাশ করে।

অনুসন্ধানী সাংবাদিকতা প্রকৃতপক্ষে অন্তর্নিহিত সত্য ও ব্যাক্তি এবং গোষ্ঠি স্বার্থে সুকায়িত সত্য নিরলস অনুসন্ধানের মাধ্যমে আবিষ্কার এবং জনসম্মুখে প্রকাশের একটি পেশাদার প্রক্রিয়া। এর লক্ষ্য, ঘটনা বা বিষয়ের চূড়ান্ত সত্য উদঘাটন যার ভিত্তিতে সমাজের সদস্যগন ও রাষ্ট্রের নাগরিকগণ রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক এবং নৈতিকতার প্রশ্নে সিদ্ধান্ত গ্রহন করেন।

পদ্ধতি বিবেচনায়, অনুসন্ধানী সাংবাদিকতা ঘটনা বা বিষয়ের পূর্ণাঙ্গ প্রেক্ষিত নির্মান করে গল্পের বহুমাত্রিক ও গভীর বিবরণের মাধ্যমে। এটি একটি পদ্ধতি অনুসরন করে। এটি বিক্ষিপ্ত বা খন্ডিত হতে পারে না। এটি প্রেক্ষাপটে পরিবর্তন আনে এবং সত্যের সামগ্রিক চিত্রায়নের মাধ্যমে জনস্বার্থ ও জাতীয় স্বার্থ সুরক্ষা ও প্রতিষ্ঠা করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ও অবদান রাখে।

অনুসন্ধানী সাংবাদিকতার গুরুত্ব:

অনুসন্ধানী সাংবাদিকতা গভীর, প্রক্রিয়া-নির্ভর, গবেষনা-নির্ভর, বিস্তারিত পদ্ধতিগত পেশাদার কাজ যার মাধ্যমে ঘটনার অন্তরালের ঘটনা, উপরিভাগের দৃশ্যমান সত্যের অন্তরালের সত্য উদঘাঁটন ও উন্মোচন করে বৃহত্তর জনস্বার্থ রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভুমিকা রাখে।

অনুসন্ধানী সাংবাদিকতার বিষয়বস্তু এবং কাংখিত সত্য অন্তরালে বা beneath the surface নিহিত ও লুকায়িত থাকে ফলে অনুসন্ধানী সংবাদ প্রতিবেদনে এমন সব ঘটনা ও সত্য উন্মোচন করা হয় যা অজ্ঞাত থাকলে একটি দেশ ও জনগনের বড় ধরণের ক্ষতি সাধিত হয়।

অনুসন্ধানী সাংবাদিকতার সংবাদ প্রতিবেদন সমাজে এবং নাগরিকের ভাবনা ও সিদ্ধান্ত গ্রহনে গভীর প্রভাব বিস্তার করে। অনুসন্ধানী সাংবাদিকতার মাধ্যমে উন্মোচিত এবং প্রকাশিত সত্য একটি সমাজে গনতন্ত্র, সুশাসন, স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা, জনস্বার্থ ও ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠায় বিশেষ গুরুত্তপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে বলে বিশ্বাস করা হয়।

ব্যাক্তি ও গোষ্ঠী স্বার্থের পরিবর্তে সমাজ ও রাষ্ট্রের সমষ্টিগত স্বার্থ নিশ্চিত করা এবং সুশাসন প্রতিষ্ঠায় অবদান রাখা অনুসন্ধানী সাংবাদিকতার অন্যতম লক্ষ্য। অনুসন্ধানী সাংবাদিকতা এই লক্ষ্য বাস্তবায়নে গণতান্ত্রিক শাসন ব্যবস্থাকে শক্তিশালী করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।

অনুসন্ধানী সাংবাদিকতা কেন করবেন:

অনুসন্ধানী সাংবাদিকতা, সময়সাপেক্ষ, ব্যয়বহুল ও ঝুকিপূর্ণ হতে পারে। দৈনন্দিন ঘটনাবলীর উপর যখন মোটামুটিভাবে সন্তোষজনকভাবে পত্রিকা বের করা যায়, তখন অনুসন্ধানী সাংবাদিকে এক ধরণের কঠিন কাজের জন্য সম্পাদকের রাজি করানোর প্রশ্ন আসে।

তাহলে কেন করবেন? কারণ নির্ভল তথ্য খুবই দারুণভাবে গল্পের মাধ্যমে সাজিয়ে তুলতে পারলে তা পরিবর্তন আনতে পারে। একটি ভালো প্রতিবেদন কমিউনিটিতে বা পলিসিতে প্রভাব রাখতে পারে।

তদপুরি অনুসন্ধানী সাংবাদিকতা গণগন্ত্রকে শক্তিশালী করার জন্য অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িত। প্রশ্ন ছাড়াই সরাকারি ভাষ্যের উপর প্রতিবেদন তৈরী করা মনে ক্ষমতাসীনদের হাতে এজেন্ডা বাস্তবায়নের হাতিয়ার তুলে দেওয়া। জনমতের প্রতিনিধিত্ব, জবাবদি ও সরকারের স্বচ্ছতারমত গণতন্ত্রিক মূলনীতিগুলোর ধস নামে, যখন গণমাধ্যম বিভিন্ন মতের পাল্টাপাল্টি দাবির যথার্থতা যাচাইয়ের কঠিন প্রশ্নগুলো করে না কিংবা তথ্য ও বিশ্লেষণ হাজির করে না।

অনুসন্ধানী সাংবাদিকতা প্রকৃত প্রস্তাবে সত্য অনুসন্ধানের একটি বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি.

দৃশ্যমান ঘটনাবলী এবং উপরিতলে অবস্থিত বিষয়াবলীর গভীরে প্রবেশ করে প্রকৃত সত্য উন্মোচন ও প্রকাশের মাধ্যমে দুর্নীতি প্রতিরোধ এবং সুশাসন প্রতিষ্ঠায় অনুসন্ধানী সাংবাদিক ভূমিকা রাখে। অনুসন্ধানী সাংবাদিকতায় দৃশ্যমান মুখোশ উন্মোচন ও সত্যের প্রকাশ ঘটে (Investigative journalists tear the mask, go beneath the surface and what is visible and expose the truth).

বস্তুত, সাংবাদিকতার যে কোনো কাজেই কিছু না কিছু অনুসন্ধানী উপাদান থাকে। কারন, ব্রিটিশ লেখক জর্জ অরওয়েলের মতে, সাংবাদিকতা হল এমন কিছু প্রকাশ করা যা অন্য কেউ প্রকাশ করতে চাইবেনা।

তবে, অনুসন্ধানী সাংবাদিকতা হল এমনই এক পদ্ধতিগত পেশাদার কাজ যা দীর্ঘ্য সময় যাবত গভীর অনুসন্ধান, বিশ্লেষণ, গবেষণা, ও পর্যবেক্ষনের মধ্য দিয়ে জনস্বার্থে এমন কোনো সত্য উদঘাটন, কিংবা দুর্নীতি কিংবা গুরুতর কোনো অনিয়মের ঘটনা প্রকাশ করা, যেখানে জাতীয়, রাষ্ট্রীয়, এবং জনস্বার্থ কিংবা মৌলিক নাগরিক অধিকার অথবা মৌলিক মানবাধিকার অথবা অন্যকোন প্রকার স্বীকৃত অধিকার লঙ্ঘনের বিষয় থাকে, যা কোনো বিশেষ ব্যাক্তি, কর্মকর্তা, গোষ্ঠী, বা কর্তৃপক্ষ পদ্ধতিগতভাবে তাদের নিজেদের স্বার্থে গোপন রাখে কিংবা গোপন রাখতে চায়।

এক্ষেত্রে, অনুসন্ধানী সাংবাদিকতার ইউনেস্কোর সংজ্ঞাটি প্রনীধানযোগ্যঃ “অনুসন্ধানী সাংবাদিকতার উদ্দেশ্য হচ্ছে গোপন বা লুকিয়ে রাখা তথ্য মানুষের সামনে তুলে ধরা। সাধারণত ক্ষমতাবান কেউ ইচ্ছাকৃতভাবে এসব তথ্য গোপন রাখে; কখনো হয়তো-বা বিপুল ও বিশৃঙ্খলভাবে ছড়িয়ে থাকা তথ্যের মধ্যে লুকিয়ে থাকে, যা চট করে খুঁজে পাওয়া কঠিন। এই কাজের জন্য একজন সাংবাদিককে সাধারণত প্রকাশ্য ও গোপন নানা উৎস (সোর্স) ব্যবহার করতে হয়, ঘাটতে হয় নানা ধরনের নথিপত্র।”

কিভাবে অনুসন্ধানী সাংবাদিক হওয়া যায়:

অনুসন্ধানী সাংবাদিক হুট করে হওয়া যায় না। অনুসন্ধিত্সা, কৌতূহল, দৈনন্দিন দৃশ্যমান ঘটনার গভীরের প্রশ্ন করার সক্ষমতা, তীক্ষ্ণ পর্যবেক্ষন, বিস্তারিত পড়শুনা, নানা প্রকার ঝুঁকি এবং হুমকির মুখে দাঁড়িয়েও  অনুসন্ধানী সাংবাদিকতার কাজ নিয়ে অগ্রসর হবার সাহস, দৃঢ় অংগীকার, আবেগ, উদ্যোগ, নিরলস পরিশ্রম করার মানসিক শক্তি এবং যেকোনো পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে অনুসন্ধানী কাজের পরিকল্পনায় পরিবর্তন গ্রহন করার নমনীয়তা একজন অনুসন্ধানী সাংবাদিকের মৌলিক পেশাগত গুনাবলী এবং মানসিক দক্ষতার ও বৈশিষ্ট্যের মূল উপাদান।

অনুসন্ধানী সাংবাদিকতা নেহায়েত কোনো প্রাথমিক উৎস কিংবা সাধারন টিপ-অফ এর উপর নির্ভর করে সাম্পাদন করা সম্ভব হয়না। এর জন্য সম্ভাব্য সকল উৎসসমূহের পারস্পারিক যাচাই করন এবং প্রাপ্ত তথ্য ও নথি-পত্র বিশ্লেষনের মাধ্যমে গভীর সত্যে উপনীত হতে হয়। অনুসন্ধানী সাংবাদিকতা একটি স্বাধীন পেশাদারি কাজ। অন্যের উপর কোনো রকম অপেশাদার নির্ভরতা এ কাজকে বাধাগ্রস্ত করে ব্যার্থ করে দিতে পারে।

অনুসন্ধানী সাংবাদিকতার আরেকটি বৈশিষ্ট্যটি হলো বস্তুনিষ্ঠতা এবং নিরপেক্ষতা যা সাংবাদিকতার মৌল ভিত্তিও বটে। অনুসন্ধানী সাংবাদিকতার মূল লক্ষ্য জনস্বার্থ৷ তবে, জনস্বার্থ রক্ষা করতে গিয়ে অন্যের আইনী ও নৈতিক অধিকার ক্ষুন্ন করলে বস্তুনিষ্ঠতা থাকে না৷ এজন্য অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে মাননিয়ন্ত্রণের বিষয়টি খুব জরুরী৷

অনুসন্ধান প্রক্রিয়ায় একজন সাংবাদিক সাংবাদিকতার পেশাগত নৈতিকতার মানদন্ড বজায় রাখবে এবং অন্যের ব্যাক্তিগত গোপনীয়তা ভংগ হয় কিংবা মানহানি হয় এমন কিছু করা থেকে বিরত থাকবে। কারন এরকম কিছু ঘটলে সংশ্লিষ্ট সাংবাদিক প্রচলিত আইনে দোষী সাব্যস্ত হতে পারেন।

সর্বোপরি, একজন অনুসন্ধানী সাংবাদিক তার তথ্যের উৎস, সূত্র এবং তথ্য সরবরাহকারি ব্যাক্তির নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সর্বোচ্চ সতর্কতা অনুশীলন করবেন যেন তথ্য-সূত্র এবং তথ্য সরবরাহকারি ব্যাক্তি কোনোভাবেই হুমকির মুখে না পড়েন এবং তাদের যেন মর্যাদাহানি না হয়।  

…………………………………

 বিষয় ৩.২:জাতীয় শুদ্ধাচার কৌশল বাস্তবায়নে অনুসন্ধানী সাংবাদিকতার গুরুত্ব 

জাতীয় শুদ্ধাচার কৌশলপত্র এবং অনুসন্ধানী সাংবাদিকতার আদর্শগত, লক্ষ্যগত, সংজ্ঞাগত এবং ধারণাগত বিশ্লেষণের দিকে দৃষ্টিপাত করলে, পরস্পর নির্ভরতা, অন্তর্নিহিত যোগাযোগ এবং প্রথমটির লক্ষ্য অর্জনে পরেরটির অনিবার্যতার বিষয়টি সহজে পরিষ্কার হতে পারে।

বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক ২০১২ সালে গৃহীত জাতীয় শুদ্ধাচার কৌশলপত্র রাষ্ষ্ট্রীয় জীবনের এবং রাষ্ট্র পরিচালনার সকল স্তরে সুশাসন, স্বচ্ছতা, নৈতিকতা ও সততা নিশ্চিত করার একটি কৌশলগত জাতীয় দলিল।  

এই দলিলে শুদ্ধাচার বলতে, আচারণে ও দায়িত্ব পালনের সকল ক্ষেত্রে এমন এক উতকর্ষতা ও মানের কথা বলা হয়েছে যা সততা ও নৈতিকতা দ্বারা অনু্প্রানীত ও প্রভাবিত।চরিত্রনিষ্ঠা ও প্রথাগত নৈতিকতার প্রতি আনুগত্য এর মূল কথা।

এই দলিলটিকে সামাজিক, রাষ্ট্রীয়, পরিবার ও ব্যাক্তি জীবণের সকল স্তরে সততা এবং নৈতিকতার মান এবং আদর্শ প্রতিষঠার এক প্রকার দীর্ঘ্য মেয়াদী পরিকল্পনা বলে বিবেচনা করা যেতে পারে, যার লক্ষ্য বাংলাদেশ রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার মৌলিক আদর্শসমূহের সহিত সংগতি রেখে, দুর্নীতি দমন ও সুশাসন প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে রাষ্ট্র ও সমাজের সকল পর্যায়ে নাগরিকের সম অধিকার, সাম্য, আত্মমর্যাদা ও মৌলিক মানবাধিকার নিশ্চিত করা, সম্পদের সুষম বন্টন ও সুষম উন্নয়ন করা, এবং শাসন ব্যবস্থ্যায় স্বচ্ছতা ও জাবাবদিহিতা নিশ্চিত করার মাধ্যমে সুশাসন প্রতিষ্ঠা করা।

এটি একটি সামাজিক আন্দলন যা পরিবার, রাষ্ট্র, সমাজ ও সকল রাষ্ট্রীয় ও অরাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানে চর্চা হবে বলে প্রত্যাশিত এবং বাংলাদেশ সরকার এই দলিলে উল্লেখিত লক্ষ্যসমূহ অর্জনের উদ্দেশ্যে নানা রকম প্রাতিষ্ঠানিক ও প্রশাসনিক ব্যবস্থা গ্রহন করেছে।

সুতরাং, এটা লক্ষ্যণীয় যে জাতীয় শুদ্ধাচার কৌশলপত্রে উল্লেখিত এবং নির্ধারিত আদর্শিক এবং নৈতিক লক্ষ্যসমূহ অর্জন করা যেমন একজন সাংবাদিকের পেশাগত লক্ষ্য, তেমনি একজন কর্তব্যনিষ্ঠ ও সচেতন দায়িত্বশীল নাগরিকেরও কর্তব্য।

জাতীয় শুদ্বাচার কৌশলপত্রের মূল কথা হলো, একটি শোষণ-বঞ্চনা-দূর্নীতি মুক্ত সমাজ প্রতিষ্ঠার পূর্ব শর্ত হলো শাসন ব্যাবস্থার সকল পর্যায়ে জাবাবদিহিতা এবং সুশাসন প্রতিষ্ঠা। এটি দুর্নীতি এবং অনিয়ম প্রতিরোধে একটি সমন্বিত কৌশলপত্র।

সাংবিধানিকভাবে, নাগরিকের জন্য আইনের শাসন, মৌলিক মানবাধিকার, সমতা, নায়বিচার,  রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, ও সামাজিক অধিকার প্রতিষ্ঠা করা যে রাষ্ট্রের লক্ষ্য ও উদ্দ্যেশ্য, জাতীয় শুদ্বাচার কৌশলপত্রের নীতিমালা অনুসরণ ও বাস্তবায়নের মাধ্যমে সরকার সেই উদ্দ্যেশ্য সমূহই অর্জন করতে চায়।   

আর এসকল বিষয় অনুসন্ধানী সাংবাদিকতারও মূল উপজীব্য।এক কথায়, উভয়ের লক্ষ্যই সুশাসন প্রতিষ্ঠা। শোষণ-বঞ্চনা মুক্ত, স্বচছ ও জবাবদিহীতা মূলক শাষণ ব্যবস্থা, আইনের শাসন, মৌলিক মানবাধিকার রক্ষা করা, অর্থনৈতিক ও সামাজিক সাম্য নিশ্চিত করা, সুষম উণ্ণয়ণ, ন্যায়বিচার ও দূর্নীতি প্রতিরোধ করা যেমন জাতীয় শুদ্বাচার কৌশলপত্রের লক্ষ্য, তেমনই এ সকল লক্ষ্য অর্জনের এক বিশেষ পেশাদার মাধ্যম হলো অনুসন্ধানী সাংবাদিকতা।

যেহেতু, অনুসন্ধানী সাংবাদিকতায় সম্ভাব্য কোন অনিয়ম বা দূর্নীতি সংগঠিত হয়েছে মর্মে ধারনা পাওয়ার ভিত্বিতে কিংবা আইনে স্বীকৃত কোন নাগরিকের স্বীকৃত  অধিকার লংঘনের ঘটনা ঘটলে কিংবা মৌলিক মানবাধিকার লংঘনের ঘটনা ঘটলে, কিংবা জনস্বার্থ বা জাতীয় স্বার্থ বিরোধী ঘটনা ঘটলে, কিংবা সম্ভাব্য কোন দুর্নীতির ঘটনা কিংবা রাষ্ট্রীয় সম্পদ লুন্ঠনের কোন ঘটনা ঘটলে, একজন অনুসন্ধানী সাংবাদিক অনুসন্ধানের মাধ্যমে সম্পূর্ণ ঘটনা উন্মোচন করে অন্তর্নিহিত সত্য উদ্ঘাটন করে তা জনগনের সম্মুখে উপস্থাপন ও প্রকাশ করে, সে বিবেচনায় জাতীয় শুদ্ধাচার কৌশলপত্রে উল্লেখিত লক্ষ্যসমূহ অর্জনের প্রক্রিয়ায় অনুসন্ধানী সাংবাদিকতার কাজ কার্যত একটি সাধারণ লক্ষ্যে সরাসরি পরিপূরকের ভুমিকা পালন করে।  

পেশাদার অনুসন্ধানী সাংবাদিকতার মাধ্যমে কার্যত রাষ্ট্র ও শাসন ব্যাবস্থায় জাবাবদিহিতা, স্বচ্ছতা ও সুশাসন প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে নাগরিকের স্বীকৃত অধিকার সমূহ এবং জনস্বার্থ সুরক্ষায় গুরুত্তপূর্ণ ভূমিকা পালন করা হয়। 

 জাতীয় শুদ্ধাচার কৌশলপত্রে নির্ধারিত আদর্শ সমূহ অর্জন, বাস্তবায়ন এবং প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে সরকার কতিপয় সহায়ক আইন-কানুন, বিধি-বিধান, ও প্রাতিষ্ঠানিক নীতিমালা, কর্মসূচী প্রণয়ন করেছেন এবং তা অনুশীলনের ব্যবস্থা নিয়েছেন।

যেমন: দাপ্তরিক বার্ষিক কর্ম-সম্পাদন চুক্তি, তথ্য অধিকার আইন, ভোক্তা অধিকার আইন, জনস্বার্থে তথ্য প্রকাশ সুরক্ষা আইন, অর্থ পারাচর নিরোধ আইন, মানব পাচার নিরোধ আইন, অভিযোগ নিষ্পতি ব্যবস্থা, একসেসে টু ইনফরমেশন কর্মসূচী, সিটিজেন চার্টার, জাতীয় মানবাধিকার কমিশন, তথ্য কমিশন, দূর্নীতি দমন কমিশন, কম্পট্রোলার, এন্ড অডিটর জেনারেলের দপ্তর, এবঙ সংসদীয় স্থায়ী কমিটি ইত্যাদি।

একজন অনুসন্ধানী সাংবাদিক স্বাভাবিক ভাবেই এ সকল সহায়ক আইন-কানুন, বিধি-বিধান, ও প্রাতিষ্ঠানিক ব্যাবস্থা ও নীতিমালা ব্যবহারের মাধ্যমে তার অনুসন্ধানী সাংবাদিকতার কাজ সম্পণ্ণ করে থাকেন যা কার্যত জাতীয় শুদ্ধাচার কৌশলপত্রের লক্ষ্য অর্জনে সঙ্গতিপূর্ণ, সমার্থক ও সম উদ্দেশ্যপূর্ণ হয়ে থাকে।            

………………………………

  অনুসন্ধানী প্রতিবেদনের স্টোরি/ধারণা কিভাবে পাবেন

অধিকাংশ খবরের ধারণা বা আইডিয়া জন্মায় সংবাদিকের নিজের আগ্রহের জায়গা থেকে। আগের প্রতিবেদন বা চলমান ঘটনার মধ্যে থাকা প্রশ্ন, কোন বিষয়ে পড়াশুনা করতে গিয়ে বিষয়টি নিয়ে জন্ম হওয়া ধারণা, ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা, কারো সাথে আলাপচারিতা কিংবা কারো কাছ থেকে শোনা কোন মন্তব্য থেকেও অনুসন্ধানী খবরের ধারণা জন্ম নিতে পারে। তবে সব সময় যে এমন ধারণা থেকে ভালো সংবাদ মিলবে এমনটা নাও হতে পারে। এজন ভালো সাংবাদিকের সবচেয়ে কঠিন কাজ হচ্ছে একটি ভালো ধারণা দাড় করানো।

 কোন ভালো সংবাদের ধারণা হুট করে চলে আসবে এমনি চিন্তা করা সঠিক হবে না। একজন অনুসন্ধানী সাংবাদিকে সব সময় চোখ কান খোলা রাখতে হয়। কাজে যাওয়ার পথে বাস্তার পাশে বন্ধ হয়ে যাওয়া ড্রেনের দিকে যেমন নজর রাখতে হবে, তেমনি হাসপাতালে সেবা নিয়ে গিয়ে কোন নার্স এর অসাদাচরণ অন্যকোন ঘটনা থেকে প্রতিবেদন বেরিয়ে আসতে পারে। সাধারণভাবে প্রথম নজরে যা দেখা যায় তার চেয়ে বেশি কিছু থাকতে পারে, যা অনুসন্ধানের দাবী রাখে। 

সব সময় সংবাদ হতে পারে এমন ঘটনার নোট রাখুন। নিজের ইন্দ্রিয়ের উপর ভরসা রাখুন, ঘটনাস্থল পরিদর্শন বা লোকজনের সাথে কথা বলার পর হয়ত এমন কিছু পেয়ে যেতে পারেন যা অন্য কেউ হয়ত খেয়াল করেনি। একজন অনুসন্ধানী সাংবাদিক সবচেয়ে ভালো প্রত্যক্ষদর্শী।  প্রতিবেদন তৈরীর ক্ষেত্রে আপনার অভিজ্ঞতা এবং পর‌্যবেক্ষণনকে অগ্রাধিকার দিন। আপনার অভিজ্ঞতা দিন শেষে কাজে না-ও আসতে পারে, কিন্তু তাই বলে একটু পরীক্ষা করে দেখার প্রাথমিক ধাপ থেকে সরে আসবেন না।

 আপনি যদি পেশা হিসেবে সাংবাদিকতাকে গুরুত্ব  দেন, তাহলে পড়াশুনা করাটা আপনার ইচ্ছা ব্যাপার না এটা আপনার পেশাগত দায়িত্ব। এটি আপনার লেখার দক্ষতাই বাড়ায়। আপনি নানা বই- প্রবন্ধ থেকে বুঝতে পারেন, কিভাবে নানা পদ্ধতি ও ব্যবস্থা কাজ করে।এটি বুঝতে পারলে আপনি কোনটা ভালো আর কোনটা খারাপ তা নির্ধারণ করতে পারবেন। একজন দক্ষ অনুসন্ধানী সাংবাদিক তার নিকট যত স্বাভাবিকভাবে যে সকল তথ্য আসে সেই সবের গুরুত্ব দেবার চেয়ে তার জ্ঞানের পরিধি বাড়াতে নতুন নতুন তথ্য অনুসন্ধান করে থাকেন।

ইনভিস্টেটিগেটিভ রিপোটার্স এন্ড এডিটরসের (আইআরই) সাবেক নির্বাহী পরিচালক হিউস্টন আইআরইয়ের ইনভেস্টেটিগেটিভ রিপোটিং হ্যান্ডবুকে পাঠকদের স্মর করিয়ে দিয়েছেন যে, অনুসন্ধানী প্রতিবেদনের অনেক বীজ বহন করেন স্থানীয় সংবাদপত্রগুলো। এসব পত্রিকায় প্রকাশিত নাম পরিবর্তন, ক্রয়-বিক্রয়, দরপত্রেরমত আইনি নোটিশে (বিজ্ঞাপন) লুকিয়ে থাকে ভালো সংবাদ কাহিনী। আপনার কাজ হচ্ছে সতর্ক থাকা, কি হচ্ছে, কেন হচ্ছে তা খকুজে বের করা। সাংবাদিকেরা যে কাজটি খুব কমই করেন, তা হলো প্রকাশিত খবরের ঘটনাপ্রবাহে নজর বা ফলোআপ। পাঠক জরিপ ও ফোকাস গ্রুপ থেকে দেখা যায় পাঠক ফলোআপ নিউজ পড়তে বেশি পছন্দ করে।তারা জানতে চান ঘটনার পরবর্তি সময় কি ঘটল। কেন এটা ঘটলো। বিশেষভাবে সেই সব সংবাদের দিকে নজর দিন যেখানে ঘটনাটি ঘটেছে সেই প্রশ্ন এড়িয়ে যাওয়া হয়েছে বা কোন ঘটনা শুধু একটি আঙ্গিক থেকে তুলে আনা হয়েছে। অনেক পড়াশুনা করলে আপনি নীরবে আড়ালে চলে যাওয়া বিভিন্ন ঘটানার দিকেও নজর দিতে পারবেন।

এছাড়া আপনি ইন্টারনেট থেকে বিভিন্ন নিউজ সাইট, ফেসবুক টুইটারেরমত সামাজিক সামাজিক নেটওয়ার্ক ব্য্রবহার করতে পারেন। এখানে বিভিন্ন ঘটনার পক্ষে বিপক্ষে নানা ধরণের মতমত পাওয়া যায়। সেখান থেকেও গুরুত্বপূর্ণ সংবাদ পাওয়া যেতে পারে।

প্রতিবেদনের ধারণা পরখ করে দেখা:

কোন প্রতিবেদনের আইডিয়া বা ধারণা আপনি যেভাবেই পেয়ে থাকুন না কেন, তার পরবর্তি পদক্ষেপ হচ্ছে; এটি আপনাকে কোথায় নিয়ে যাবে তা পরখ করে দেখা। সম্ভব্য পক্ষপাত এবং বাঁধা বিপত্তি সস্পর্কেও সচেতন থাকা।  

গোপন তথ্যের সুত্র মূল্যায়ন:

অনুসন্ধানী সাংবাদিকতার অনেক প্রতিবেদনের সুচনা হতে পারে পারে গোপন সোর্স বা সুত্র থেকে পাওয়া তথ্য থেকে। কিন্তু এসব তথ্য যেমনটি ধারণা করা হয় তেমনটি নাও হতে পারে। এমনকি অসত্য বা কাউকে ফাঁসানোর জন্যও হতে পারে। এগুলো আংশিক সত্য হতে পারে, যাতে করে অন্য কারো উদ্দেশ্য হাসিল হয়। এই ক্ষেত্রে প্রথমেই যে কাজটি অবশ্য করাতে হবে তা হলো, আপনাকে যে গোপন তথ্য দেওয়া হয়েছে তার সস্পর্কে কয়েকটি প্রশ্নে উত্তর খোঁজা। গোপন সুত্রে পাওয়া তথ্য নিয়ে কাজ করার সময় প্রথমে যে প্রশ্ন করা উচিত:

  • গোপন সুত্র থেকে তথ্য না পেলেও আমি কি বিষয়টি নিয়ে লিখতাম?
  • বিষয়টি কি এমন, যা সস্পর্কে আমার আগ্রহ রয়েছে?
  • যেসত্য প্রকাশিত হয়েছে তাতে কি সত্যিেই কোন জনস্বার্থ আছে?

এই তিনটি প্রশ্নের ক্ষেত্রেই আপনার উত্তর যদি হ্যা হয়, তাহলে আপনি কাজটি শুরু করতে পারেন।

 বিষয় ৩.৩: অনুসন্ধানী প্রতিবেদন তৈরির ধাপসমূহ

সাধারনভাবে, অনুসন্ধানী সাংবাদিকতায় কাংখিত লক্ষ্য অর্জন করতে কতিপয় পদ্ধতিগত (systematic) ধাপ অনুসরন করতে হয়। যেমনঃ (ক)পর্যবেক্ষণ/ বিশ্বস্ত  সূত্রের তথ্য/ ঘটনার ফলো-আপ ইত্যাদি। অনুসন্ধানী সাংবাদিক জনস্বার্থ পরিপন্থী কোনো ঘটনা বা বিষয় বা আপাত অনিয়ম লক্ষ্য করলে তা পর্যবেক্ষণ করে, প্রশ্ন করে এবং সম্ভাব্য অনুসন্ধানের একটি ধারনা বা ক্ষেত্র অনুমান ও প্রস্তত করে।

যেমনঃ বহুল আলোচিত উন্নয়ন প্রকল্প পদ্মা সেতু, দেশের প্রথম মেট্রো রেইল, পায়রা সমূদ্র বন্দর, মাতারবাড়ি বিদ্যুৎ প্রকল্প, মাতারবাড়ি গভীর সমুদ্রবন্দর, রূপপূর আনবিক শক্তি বিদ্যুৎ প্রকল্প, কর্নফুলী টানেল প্রকল্প ইত্যাদি জনগনের কত অর্থ ব্যায়ে নির্মিত হচ্ছে? প্রতিবেশী ভারত, এশিয়ার আঞ্চলিক এবং আন্তর্জাতিক মানদন্ডে এই ব্যায় কি সংগতিপূর্ণ এবং যুক্তিসংগত?  যদি সংগতিপূর্ণ না হয়, তবে অতিরিক্ত ব্যায়ের কারণ কি এবং তাতে কে কিভাবে লাভবান হয়েছে? জনগনের কস্টার্জিত অর্থের কি অপচয় হয়েছে? জনগনের অর্থের অপচয়ের যথার্থতা / Justification কি? কিভাবে তা নিরুপন করা হয়েছে? কে নিরুপন করেছে? কি পদ্ধতিতে নিরুপন করেছে? এসকল প্রকল্প গ্রহন ও বাস্তবায়নে প্রচলিত আইন ও সরকারি ক্রয় নীতিমালা অনুসরণ করা হয়েছে কিনা, ঠিকাদার এবং বাস্তবায়নকারী কতৃপক্ষের প্রয়োজনীয় যোগ্যতা আছে কিনা, কারিগরী যোগ্যতা আছে কিনা, যথাযথভাবে প্রকল্পের সম্ভাব্যতা যাচাই হয়েছে কিনা, পরিবেশ আইনের বিধান মানা হয়েছে কিনা, একটি প্রকল্প  বাস্তবায়নে কি পরিমান মানবিক, সামাজিক এবং পরিবেশগত/ প্রতিবেশগত মূল্য দিতে হবে এবং সর্বোপরি, যে সকল লক্ষ্যে প্রকল্পটি গ্রহন করা হয়েছে, বাস্তবায়িত হলে প্রকল্পটি কাংখিত লক্ষ্য সমূহ অর্জন করতে সক্ষম কিনা, এসব সাধারন প্রশ্নের জবাব অস্পষ্ট হলে বা জবাব না পাওয়া গেলে এক বা একাধিক অনুসন্ধানী প্রতিবেদনের সূত্রপাত হতে পারে। এসকল প্রশ্নের আলোকে যে কোন ঘটনা বা বিষয়কেই অনুসন্ধানী সাংবাদিকতার কাজে বিবেচনা করা যেতে পারে।

 যেমনঃ করোনা মহামারিকালে রাষ্ট্রের কোষাগার থেকে কত অর্থ অনুদান এবং প্রোনোদনার লক্ষ্যে বরাদ্দ করা হয়েছে এবং তা যথাযথভাবে ব্যয় হয়েছে কিনা। চিকিৎসা সামগ্রী ক্রয়ে অর্থ যথাযথভাবে প্রচলিত আইন ও ক্রয় বিধিমালা অনুসরনে ব্যয় হয়েছে কিনা এবং ক্রয়কৃত সামগ্রী জনগনের কতটুকু উপকারে এসেছে বা কাজে লেগেছে ইত্যাদি।

প্রতিদিনের সংবাদ অনুসরন এবং এমনকি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে থেকেও একটি অনুসন্ধানী সাংবাদিকতার কাজের ধারনা নির্মানের সুত্রপাত হতে পারে এবং এর উপাদান ও প্রাথমিক রসদ সংগ্রহ করা যেতে পারে। কাজেই, একজন অনুসন্ধানী সাংবাদিকের চোখ-কান খোলা রেখে গভীর পর্যবেক্ষনের দৃষ্টি থাকা অত্যন্ত জরুরী।

এই পর‌্যায়ে নিচের প্রশ্নগুলো বিবেচনায় নিতে হবে;

কি ঘটছে, কেন আপনার পাঠক বিষয়টিতে আগ্রহী হবে?

এর সঙ্গে কারা জড়িত। কিভাবে তার এটি করেছে। এর ফলাফল কি হয়েছে?

কী ভূল/অনিয়ম হয়েছে। কীভাবে এই ভূল/অনিয়ম হয়েছে।এর পরিণতি কি?

খবরটি প্রকাশিত হলে কারা সুবিধা পাবেন এবং কারা অসুবিধায় পড়বেন। সংবাদটি প্রকাশিত হলে সমাজের আচরণ বা মূল্যবোধ নিয়ে কি কোন বিতর্ক তৈরী হবে। বিশেষ এই খবরটিতে কি পদ্ধতি বা প্রক্রিয়ার ত্রুটিরকথা উঠে আসবে।     

পরিকল্পনা তৈরী:

একজন অনুসন্ধানী সাংবাদিক প্রকৃত সত্য উদঘাটনের ভিত্তিতে অনুসন্ধানী প্রতিবেদন তৈরির লক্ষ্যে একটি বিশদ, বিস্তারিত ও ধারাবাহিক পরিকল্পনা গ্রহন করেন।

বাজেট প্রস্তুত: অনুসন্ধানী বিষয়ের পরিকল্পনাটি  একটি প্রকল্পের আদলে তার নিয়োগকারী প্রতিষ্ঠানের নিকট অথবা সম্ভাব্য অর্থ-সহায়তাকারী সংগঠনের নিকট অথবা তিনি স্বনির্ভর হলে তার নিজের জন্য একটি প্রস্তাব আকারে সম্ভব্য বাজেট উপস্থাপন করবেন।

গবেষণা, গবেষণা এবং গবেষণা: নির্ধারিত বিষয়ের সকল দিকের বিশদ পাঠ ও  আলকপাত করা এবং প্রস্তাবিত প্রতিবেদনের সম্ভাব্য সকল দিক তুলে ধরার লক্ষ্যে একজন অনুসন্ধানী সাংবাদিক ধারাবাহিক গবেষণা করবেন। ঘটনার অন্তরালের ঘটনা এবং চূড়ান্ত ও প্রকৃত সত্য উদঘাটনে সংশ্লিশ্ট ব্যাক্তিদের আনুষ্ঠানিক এবং অনানুষ্ঠানিক (অফ-রেকর্ড) বিশদ

 সাক্ষাতকার প্রহণ:  সাক্ষাতকার গ্রহন করা একজন অনুসন্ধানী সাংবাদিকের জন্য একটি অতি গুরুত্তপূর্ণ কাজ। প্রকৃত ও চূড়ান্ত সত্যে উপনীত হওয়ার লক্ষ্যে, ঘটনার অন্তরালের ঘটনাসমুহের সূত্র ও সাদৃশ্য খুজে বের করে তা অনুসরণপূর্বক তিনি ঘটনাবলীর একটি অন্তযোগ ও আন্তযোগ বা Pattern নির্ধারণ করবেন।এরই ধারাবাহিকতায়, উন্মোচিত সত্য প্রমান ও প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে প্রকাশিত বা উন্মুক্ত তথ্যের পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট বিষয়ের সাক্ষতকার গ্রহণের প্রশ্ন তৈরীসহ প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি গ্রহণ।

নথি সংরক্ষণ ও পর‌্যালোচনা : সংশ্লিষ্ট বিষয়ে দাপ্তরিক নথিপত্র/ ডকুমেন্ট/ রেকর্ড-পত্রের অনুলিপি সংগ্রহ করবেন যা সত্যের অকাট্য প্রমান হিশাবেও গুরুত্তপূর্ণ। অনেক ক্ষেত্রে প্রকাশিত নথি-পত্রে প্রাপ্ত তথ্যসমূহ পরস্পর তুলনা, বিশ্লেষন এবং সংযোগ সাধনের মাধ্যমেও অনুসন্ধানের কাজ অনেকটাই অগ্রসর করে নেয়া সম্ভব। তবে, প্রাপ্ত তথ্যসমূহ ক্রমাগত যাচাইয়ের মাধ্যমে তথ্যের সঠিকতা প্রমান করা অতি গুরুত্বপূর্ণ।

এ সকল দীর্ঘ্য অনুশীলন শেষে অনুসন্ধানকৃত ঘটনা বা বিষয়ের সত্যটি আবিষ্কারের পূর্ণ ক্ষেত্র প্রস্তুত হলে পরে,  সুচিন্তিত, যথাযথ, প্রাসংগিক এবং সুনির্দিষ্ট (জ)প্রশ্ন প্রস্তত করে যথাযথ ব্যাক্তি, প্রতিষ্ঠান ও কর্তৃপক্ষের নিকট উপস্থাপন করে সংগঠিত সম্ভাব্য অনিয়ম, দূর্নীতি এবং বৃহত্তর জনস্বার্থ লঙ্ঘনের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট দায়িত্বশীলদের (Those, who are responsible) যথার্থ জবাব সংগ্রহ করতে হবে।এই সমগ্র বিষয়াদি নির্ধারণ এবং পরিকল্পনা প্রনয়নে একজন সাংবাদিক অন্য একজন জ্যেষ্ঠ, অভিজ্ঞ এবং অনুসন্ধানী সাংবাদিক সহকর্মীর সহায়তা ও নির্দশনা / Guidance  নিতে পারেন।

এই দীর্ঘ্য অনুশীলন এবং গবেষণা পরিচালনার প্রতিটি ধাপে সংগৃহিত তথ্য-উপাত্ত সমূহ সর্বোচ্চ সতর্কতার সহিত সুরক্ষার ব্যাবস্থা নিতে হবে। কেননা, অনুসন্ধান চলাকালীন মাঝপথে কোনো গুরুত্তপূর্ণ তথ্য ফাঁস হয়ে গেলে সমগ্র অনুসন্ধানী প্রতিবেদনের কাজটি এবং সাংবাদিক নিজেও হুমকির মুখে পরতে পারেন এবং অনুসন্ধানের পুরো কাজটিই ভেস্তে যেতে পারে।

প্রতিবেদন লেখা:

সবকটি ধাপ সম্পন্ন করার পর  সংগৃহিত তথ্য, নোট, নথি-পত্র, সাক্ষাতকার সমন্বয়ে প্রতিবেদনটি লেখা শুরু করা এবং প্রকাশের জন্য উপাস্থাপন করা। তবে, লেখার আগে সাংবাদিককে পরিষ্কার করে নিতে হবে তার উদ্ঘাটিত সত্যটি কি এবং তিনি কি বলতে চান তা সহজে এবং সাবলীল ভাবে লিখতে হলে চিন্তার স্বচছতা এবং সাবলীলতা অতি জরুরি। একটি অনুসন্ধানী প্রতিবেদন প্রকাশের পর আরো একাধিক ফলো-আপ বা অনুগামী প্রতিবেদনের ক্ষেত্র অবারিত হতে পারে এবং সে সকল প্রতিবেদন করার পরিকল্পনা গ্রহন করাও একজন অনুসন্ধানী সাংবাদিকের জন্য জরুরি কাজ।       

গ্লবাল ইনভেষ্টিগেটিভ জার্নালিজম নেটওয়ার্কের মতেঃ অনুসন্ধানী সাংবাদিকতায় সুনির্দিষ্ট কিছু প্রণালি অনুসরণ করতে হয়। এটি এমন এক ধরনের শিল্প, যা মুঠোয় আনতে বছরের পর বছর চেষ্টা করে যেতে হয়। অনুসন্ধানী সাংবাদিকতায় শ্রেষ্ঠ পুরস্কার পাওয়া প্রতিবেদনগুলো দেখলেই বোঝা যায়, কত ব্যাপক গবেষণা আর কঠোর শ্রম এর পেছনে ব্যয় করা হয়েছে। কঠিন একাগ্রতা, আর বিষয়ের গভীরে যাওয়ার নিষ্ঠা আছে বলেই এই স্টোরিগুলো জনগণের সম্পদ লুট, পরিবেশ বিপর্যয়, ক্ষমতার অপব্যবহার, স্বাস্থ্যসেবার করুণ দশা ইত্যাদি এত জোরালোভাবে তুলে ধরতে পেরেছেন।

প্রতিবেদন কিভাবে লিখবেন;

কোন প্রতিবেদনের মাধ্যমে পাঠকের মনে প্রভাব ফেলতে চাইলে আপনাকে এর মূল বিষয় নিয়ে চিন্তা করতে হবে এবং সবচেয়ে শক্তিশালী চিত্রটি তুলে ধরতে হবে। পাঠকের মনোসংযোগ আকৃষ্ট করার বিষয়ে জ্যেষ্ঠ মার্কিন সাংবাদিক স্টিফেন ফ্রাস্কলিনের পরামর্শ হলো, শুরুতেই অত্যন্ত ব্যক্তিগত বিষয়কে প্রধান্য দিন যাতে একটি জোরালো সূচনার ছবি পাওয়া যায়। প্রথমেই জানানো উচিত শুধু নুন্যতম মৌলিক তথ্য, যার বিস্তারিত আপনি পরে খোলসা করবেন। তবে যা খুজে পেয়েছেন তা সততার সাথে লেখাও জরুরী। প্রতিবেদনের সাথে যায় না এমন বিষয় দেখানোর চেষ্টা করবেন না বা ঘটনাকে চাঞ্চল্যকর প্রমানের চেষ্টা করবেন না। পাঠকের বিশ্বাস অর্জনের বিষয়টি সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন। তাই আপাতদৃষ্টিতে অসত্য বলে মনে হয়, এমন বর্ণনা দিয়ে শুরু করলে আপনার পুরো উদ্যোগই ক্ষতিগ্রস্থ হতে পারে।

তথ্যগুলো দেওয়ারপর আপনার অনুসন্ধানের উদঘাটনগুলো জানিয়ে সেগুলো প্রমান তুলে ধরুন। শব্দচয়নে অসর্কতা বা তথ্যপ্রমানের সংযুক্তিতে দূর্বলতা রেখে প্রতিবেদনটি খেলো বানিয়ে ফেলবেন না।

মনে রাখার মতো কয়েকটি বিষয় এখানে:

হতে হবে নির্ভল;

বর্ণনা ও উদাহরণ:

আপনার পাঠকের জন্য পেশাজীবিদের বিশেষ ভাষা ও জটিশ বিষেশণের ব্যাখ্য দিতে হবে এবং প্রতিবেদন জুড়ে এই ব্যাখ্যা বজায় রাখতে হবে। এছাড়া উদাহরণের মাধ্যমে এই সব জটিল শব্দকে বোধগম্য করতে হবে। 

অপ্রমানিত বিষয়ে সরলীকরণ:

সর্বাধিক’ ‘অনেক’ ‘কিছু’ বা ‘কয়েকটি’- এমন শব্দগুলোর পার্থক্য ও অর্থ বুঝতে হবে। যথাযথোভাবে শব্দগুলোর মধ্যে পার্থক্য করতে হবে। ‘সর্বাধিক ও ‘অনেক’ -এর মধ্যে পার্থক্য করার ক্ষেত্রে অতি সাবধানতা অবলম্বন করতে হবে এবং ‘সবাই’ বা ‘কেউ না’ এর মধ্যে পার্থক্য করার ক্ষেত্রে আরও সাবধানী হতে হবে। কোন কিছু কি ‘একমাত্র কারণ’ নাকি ‘অনেকগুলো কারণের একটি’? এটি কি ‘সব সময়ই ’ নাকি ‘প্রায়শই’? বাস্তব উদাহরণ ও নাম উল্লেখ করা ব্যক্তিদের উদ্ধৃতি দিয়ে বিষয়টিকে  সহজকরে বোঝাতে হবে।

যুক্তিকে শক্তিশালী করা:

সাবধনতার সঙ্গে সুনিদিষ্ট বিবরণ দিয়ে সব বক্তব্য-বিবৃতির যুক্তিগুলো তুলে ধরুন। যখন আপনার একটি ধারণা বা আইডিয়াকে সমালোচনা করার কথা, তখন কোন ব্যক্তিকে আক্রমন করবেন না। তথ্য ও যুক্তি দিয়ে আলোচনার মধ্যেই থাকুন। কোন সুবিধা নেওয়ার বিষয় সিদ্ধান্তগুহণের পক্ষে বা বিপক্ষে প্রভাব ফেলছে কি না, তা পাঠককেই ঠিক করে নিতে দিন। কখনও কখনও তথ্যপ্রমানগুলোই আপনার হয়ে কথা বলবে।

প্রমানক হিসেবে কর্তৃপক্ষের উদ্ধৃতি:

কোন বিষয়ে ভালো বা মেন্দর তালিকা করুন এবং সেগুলো ব্যবহারে ভারসাম্য বজায় রাখুন। কর্তৃপক্ষের নেওয়া প পদক্ষেপের পেছনের কারণগুলোতে মনোযোগ দেওয়া গুরুত্বপূর্ণ। কেউ কিছু বললে তা কেন বলছে, সেটা বোঝা দরকার। ঘটনার পটভুমির  জন্য একটি উৎস নয়, বরং প্রাসঙ্গিক একাধিক ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে কথা বলরুন, গবেষণা করুন।

সংস্কার, গৎবাঁধা আবেগ:

ইতবাচক হোন বা নেতিবাচক-গৎবাধা ভাষা এড়াতে হবে এবং তা হতে হবে নিরপেক্ষ। আর সব সুত্র্রকে সমাজ সংশয়ের চোখে দেখুন।

জিজ্ঞসা করা, তাহলে কী:

আপনার হাইপোথিসিসের সাথে কোন তথ্য প্রাসঙ্গিক কি না, তা স্মরণ করিয়ে দেবার একটি ভালো উপায় নিজেকে নিজেকে এই প্রশ্ন জিজ্ঞেস করা, তাহলে কী।

অনুচ্ছেদের পর অনুচ্ছেদ সাজিয়ে লেখা:

আপনার প্রতিবেদনটি চিন্তা করুন বেশ কয়েকটি পর্বের সমষ্টি হিসেবে। এবং প্রতিটি পর্বে থাকবে বেশ কয়েকটি অনুচ্ছেদ। এই পর্বগুলোতে আপনার অনুসন্ধানের একেকটি দিক উঠে আসবে। এবং সেগুলো সস্পর্কে বিস্তারিত বর্ণনা থাকবে। একটি বৃহৎ দৃশকে কয়েকটি ভাগে বিভক্ত করে উপস্থাপন করলে পাঠকের বুঝতে সুবিধা হবে। প্রতিটি অনুচ্ছেদে যে বিষয় গুলো থাকা উচিৎ:

(১) তথ্যপ্রমান (বিস্তারিত, বিবৃতি,যুক্তি, সংখ্যা) ২. সংজ্ঞা বা ব্যাখ্যা ৩. প্রসঙ্গ, ইতিহাস, তুলনা বা পার্থক্য ৪. কারণ কিংবা প্রভাব ৫. পক্ষে ও বিপক্ষে যুক্তি ৬. ফলাফল নিয়ে বিশ্লেষণ বা পরামর্শ।

সস্প্রচারের জন্য কিভাবে লিখবেন;

সব সস্প্রচার প্রতিবেদনেরই ভিডিও বা অডিও উদ্ধৃতি থাকে। একই ছবি ও উদ্ধুতি পটভূমিভেদে অনেক ধরণের গল্প বলতে পারে। পারিপার্স্বিক  ভাষ্যের লক্ষ্য হলে আপনার গল্পটি শ্যোতাদের বুঝতে পারার বিষয়টি নিশ্চিত করা। 

একটি বুদ্ধিদীপ্ত লেখা খুবই খুবই সাধারণ কোন ছবি বা গতানুগতিক উদ্ধৃতিকে নতুন আলোকে দর্শকদের কাছে হাজির করতে পারে। রেডিওতে ধারণকৃত বক্তব্যের আলোকে স্কিপ্ট লেখা হলে সেটি হয় সবচেয়ে জোরালো। কিন্তু টেলিভিশনের ক্ষেত্রে প্রভাবের ৮৫ শাতংশ নির্ভর করে ছবির ওপর। বিরক্তিকর ছবি ও উদ্ধৃতির সমস্যা ভালো লেখায়ও দুর হয় না। এর মাধ্যমে দর্শক ‘ধরা’ যায় না এবং তারা মুখ ফিরিয়ে নেন। উভয় ক্ষেত্রেই ছবি বা রেকর্ড করা উদ্ধৃতিকে কেন্দ্র করে আপনার গল্প সাজাতে হবে। এই বিষয়কে বলা হয় ‘কানের জন্য লেখা’, ‘ছবির জন্য লেখা’ অথবা ‘শব্দের জন্য লেখা”।

ক্যামেরায় ধারণ করেছেন এমন কিছু ঘটনাস্থলের খবর বা ‘গ্রাউন্ড রিপোর্ট’ দিয়ে আপনি শুরু করুন। এরপর আপনার নিজস্ব মন্বব্যে সাবধানে নির্বাচিত শব্দ ব্যবহার করুন এবং পরের ধাপে অগ্রসর হোন।;

১. রিপোর্টের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিকগুলোতে জোর দিন।

২. ছবি ও উদ্ধৃতি  যেখানে শুধু কয়েকটি দিক তুলে ধরেছে, সে রকম অবস্থায় ভারসাম্য আনার চেষ্টা করুন।

৩. যে বিষয়গুলোতে আপনি দর্শকদের মনোযোগী করতে চান, সেগুলো নির্বাচন করে তার উপর জোর দিন।

৪.বিভিন্ন চিত্র ও উদ্ধৃতিগুলো সংযুক্ত করুন এবং সময়ের সঙ্গে এগুলো কিভাবে বদলেছে, তা ব্যাখ্যা করুন।

৫. চিত্র ও উদ্ধৃতিগুলো প্রাসঙ্গিক করুন্

৬. চিত্র বা উদ্ধৃতি গুলোর যে ব্যাখ্যা বা অর্থ বোঝাতে চান, সেগুলো যোগ করুন (তবে তথ্য বিকৃত করবেন না কিংবা বাদ দেবেন না!)।

উপস্থাপক বা রিপোর্টাররা এই সব বিষয় মেনে চলতে পারেন এবং এগুলো মানা উচিত। তবে এর মানে এই নয় যে, তিনি সব সময় দর্শক বা সংবাদের মাঝখানে ফিল্ডারের মতো থাকবেন বা প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করবেন। আপনার রিপোর্টে কোন ব্যক্তির বক্তব্য প্রাসঙ্গিক হলে স্টেশনের নিজস্ব কন্ঠ ব্যবহার বা নিজস্ব ভাষায় প্রচারের চেয়ে সেই ব্যক্তির কন্ঠকেই সব  সময় প্রধান্য দেওয়া উচিত।

ছাপা প্রকাশনা এবং সস্প্রচারমাধ্যমের পার্থক্য

ছাপা প্রকাশণাসস্পচারমাধ্যম
পত্রিকায় পাঠকেরা যখন কিছু পড়েন, সেটি না বুঝলে তিনি পেছনে ফিরে গিয়ে আবার পড়তে পারেন।সস্প্রচারিত সংবাদগুলো একবারই মাত্র দর্শকের সামনে দিয়ে চলে যায়। এ কারণে দর্শকদের মধ্যে বিস্তারিত মনে রাখার চেয়ে কিছুটা ধারণা পাওয়ার সম্ভবনাই বেশি থাকে। সস্প্রচারিত সংবাদে পুরো প্যাকেজের ধরন সে কারণেই বেশ গুরুত্বপূর্ণ।
পড়ার সময় ভূলগুলো চোখে পড়ে এবং পাতাতেই থেকে যায়।সস্প্রচারমাধ্যম দর্শকেরা প্রথমবারেই ভূলটি ধরতে পারেন অথবা কখনোই তার ভূল ধরতে পারে না।
পাতা ধরে পড়ার সুবিধার্থে সেখানে শিরোনাম, ক্যাপশন ও অনুচ্ছেদের মতো চিহ্নগুলো স্পষ্টভাবেই থাকে।সস্প্রচারমাধ্যমে মাঝামাঝি দেখতে এসে সেখানে কী চলছে, তা বোঝা নতুন দর্শকের জন্য বেশ কষ্টকর।
পাঠকেরা পড়া বন্ধ রেখে চলে যেতে পারেন এবং অন্য কিছু করতে পারেন। আবার যখন তারা ফিরে আসবেন, কোন কিছু না হারিয়ে যেখানে পড়া থামিয়েছিলেন, সেখানে থেকেই আবার শুরু করতে পারেন।রেকর্ড করা না হলে বা ইন্টারনেটে না পাওয়া গেলে সস্প্রচারের ক্ষেতত্রে দেখা থামিয়ে দিয়ে অন্য কাজ করা সম্ভব নয়।
ছবি ও মাল্টিমিডিয়া কনটেন্ট প্রতিবেদনের বিশ্বাসযোগ্যতা বাড়াতে পারে। অনলাইন প্রকাশনা তাদের আস্থা বাড়াতে এই সুবিধা কাজে লাগাতে পারে।সস্প্রচারিত সংবাদে বক্তব্যের পক্ষে দর্শকদের আরও বেশি প্রমান দেওয়া হয় (উদাহরণ: শব্দ, ছবি) যা একে আরও বেশি বিশ্বাসযোগ্য করে (এমনও শোনা যায় ‘এটি অবশ্যই সত্য: আমি টিভিতে দেখেছি’)। একই কারণে, এটি সত্যকে আরও জোরালোভাবে বিকৃত করতে পারে।
পড়তে বেশি সময় লাগলেও লিখিত রিপোর্ট থেকে পাঠক অনেক বেশি বিস্তারিত তথ্য পেতে পারেন।সস্প্রচারিত সংবাদের জন্য উচ্চ শিক্ষিত হওয়ার প্রয়োজন নেই। তবে বৈচিত্রময়, দ্রুত চলা, প্যাকেজ বোঝার জন্য ভালো সাধারণ জ্ঞান প্রয়োজন।

পডকাস্ট ব্যতীত সস্প্রচারিত সংবাদ শুধু সময়ের সঙ্গে সঙ্গেই ঘটে। এখানে পত্রিকার মতো বস্তুগত কোন বিষয় থাকে না।

এসব কারণে সস্প্রচারিত সংবাদ এবং দর্শকেদের এগুলো গ্রহণ করার ধরণ থেকে বোঝ যায়, সস্প্রচারের জন্য যে ভাষয় আগাতে হয়, সেটি প্রিন্ট মিডিয়াতে ব্যবহারের ভাষা থেকে ভিন্ন। অবশ্য  মাধ্যম যা-ই হোক না কেন, সংক্ষিপ্ত সময় ও জায়গার মধ্যে আপনাকে উল্লেখযোগ্যসংখ্যক তথ্য অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। তাই ‘অতি গুরুত্বপূর্ণ বা আকর্ষনী তথ্য’ অথবা ধারণা খুজে নিনি, যা দ্রুততম সময়ে আপনার দর্শকদের ধরতে পারবে। আর এটি ব্যবহার করুন আপনার অনুসন্ধানী প্যাকেজের শুরুতেই।…………………………

 বিষয় ৩.৪: অনুসন্ধানী প্রতিবেদনের জন্য তথ্য সংগ্রহের টুলস বা হাতিয়ার সমূহ

অনুসন্ধানী সাংবাদিকতায় অনুসন্ধান পরিচালনা এবং তথ্য সংগ্রহের কাজে মূলত সাক্ষাৎকার, পর্যবেক্ষণ, নথি-পত্র, ইন্টারনেট, জরীপ এবং প্রশ্ন সাধারনভাবে হাতিয়ার উপায় হিশাবে ব্যাবহার হয়ে থাকে। তবে, বিগত কয়েক দশকে বিশ্বব্যাপী তথ্য অধিকার আইন প্রচলন ও কার্যকর হওয়ার পর থেকে, এই আইনটি অনুসন্ধানী সাংবাদিকতায় তথ্য সংগ্রহে অতি গুরুত্তপূর্ণ একটি হাতিয়ার হিশাবে সাংবাদিকরা এটি ব্যাপকহারে ব্যাবহার করে থাকেন, যদিও বাংলাদেশে এই আইনটি কার্যকর হবার পর এক যুগ সময় পেরিয়ে গেলেও এর প্রয়োগ, প্রসার এবং ব্যাবহারের মাত্রা এখনও কাংখিত পর্যায়ে পৌছায় নাই। সুতরাং, অনুসন্ধানী সাংবাদিকতায় একটি ধারনার সম্ভাব্যতা যাচাই এবং এর পটভুমি নির্মানে এ ছয়টি হাতিয়ার ভিত্তি হিশাবে কাজ করে। পরস্পর যাচাই বা তথ্য Tally করার ক্ষত্রে এ হাতিয়ারগুলো একে অন্যের পরিপুরক হিশাবেও কাজ করে।         

একটিমাত্র সূত্র বা single source এর উপর নির্ভর করে অনুসন্ধানী সাংবাদিকতার কাজ সম্পন্ন করা সম্ভব না। কারন, অনুসন্ধানী সাংবাদিকতার কাজে একটি ঘটনা বা বিষয়ের বহুমাত্রিক দিকের সমাহার, সংযোজন ও সমন্বয় ঘটাতে হয়। আবার, একজন অনুসন্ধানী সাংবাদিক কতটা দক্ষতার সহিত এসব হাতিয়ার ব্যাবহার করতে পারেন তার উপর নিরভর করে তার অনুসন্ধানের কাজটি কতটা সফল হবে।  

জার্মান ডয়েচে ভেলে বাংলা সার্ভিসের মতে, অনুসন্ধানী প্রতিবেদনের একটি মৌলিক ও গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য হলো এখানে একাধিক সূত্র ও হাতিয়ার (টুলস) ব্যবহার করে তথ্যের সত্যতা নিশ্চিত করতে হয়৷ এবং কোন তথ্য বা অভিযোগ যতক্ষণ পর্যন্ত কমপক্ষে দুটি সোর্স বা টুলসের মাধ্যমে প্রমাণ করা না যাবে ততক্ষণ পর্যন্ত তা রিপোর্টের মুখ দেখতে পারে না৷

ইনটারনেটঃ বর্তমান সময়ে ইনটারনেটের ব্যাবহার এবং সাহায্য ছাড়া অনুসন্ধানী প্রতিবেদন করা প্রায় অসম্ভব। বর্তমান যুগের সাংবাদিকতাকে বলা হয় Computer-assisted journalism। বস্তত, গত দুই দশকে বিশ্বব্যাপী সাধারন এবং অনুসন্ধানী সাংবাদিকতার ক্ষেত্রে ইনটারনেটের ব্যাবহার বৈপ্লবিক পরিবরতন এনেছে। কারন, ইনটারনেট এখন অনুসন্ধানী সাংবাদিকতার বড় হাতিয়ার এবং তথ্যের উতস। পটভুমি গবেষনা এবং অনুসন্ধানী সাংবাদিকতার ধারনার সম্ভাব্যতা যাচাইয়ের ক্ষেত্রে ইনটারনেট প্রাথমিক গবেষনার টুল হিশাবে ব্যাবর্হৃত হয়। বিস্তারিত তথ্য সংগ্রহ এবং তথ্য যাচাই উভয় উদ্দেশেই ইনটারনেট অত্যন্ত গুরুত্বপুর্ণ উতস এবং মাধ্যম।                          

নথি-পত্রঃ একজন সাংবাদিক অনুসন্ধানী প্রতিবেদনের মাধ্যমে অনিয়ম ও দুরনীতির ঘটনা উন্মোচন করে তা জনসমক্ষে তুলে ধরেন। সে কারনে, একটি নির্দিষ্ট দুর্নীতি কিংবা অনিয়ম কিংবা অধিকার লঙ্ঘনের ঘটনা কিভাবে সংগঠিত হয়েছে তার দালিলিক প্রমান দেয়ার নিমিত্তে ঘটনা বা বিষয়ের সংশ্লিষ্ট নথি-পত্র সংগ্রহ করতে হয়। প্রাপ্ত নথি-পত্রের উপর নির্ভর করে অনুসন্ধানী প্রতিবেদনের সফলতা এবং গতি-প্রক্রিতি। অনানুষ্ঠানিক সূত্র থেকে প্রাপ্ত তথ্যের যথার্থতা, সঠিকতা প্রমানেরও উপায় এই নথি-পত্র। এক্ষেত্রে, ফাইল, রেকর্ড, চুক্তি, সমঝোতা স্মারক, রেজিষ্ট্রার, রশীদ, চিঠি-পত্র, চার্ট, ছবি, কম্পিউটার এবং ইলেকট্রিক মাধ্যমে সংরক্ষিত দাপরিক তথ্য নথি-পত্রের অন্তরভুক্ত। নথি-পত্রের অভাবে অনুসন্ধানী প্রতিবেদনের কাজ আইনী বাধার মুখেও পরতে পারে। সর্বোপরি, অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে উন্মোচিত অনিয়ম-দূর্নীতি বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে প্রশ্নের মুখোমুখি করতে হলে নথি-পত্রই প্রধান ভিত্তি।

সাক্ষাৎকারঃ সাক্ষাৎকার অনুসন্ধানী প্রতিবেদনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ উপাদান যার মাধ্যমে অনানুষ্ঠানিক সূত্র থেকে প্রাপ্ত তথ্য এবং নথি-পত্রের বিশদ ব্যাখ্যা পাওয়া সম্ভব। সংশ্লিষ্ট সকল তথ্যের সহজ-সঠিক অর্থ উদ্ধার করার ক্ষেত্রেও বিশষজ্ঞ সাক্ষাৎকার অতি গুরুত্বপূর্ণ। সাক্ষাৎকারের মাধ্যমে প্রাপ্ত বক্তব্য, তথ্য এবং ব্যাখ্যা অনুসন্ধানী প্রতিবেদনকে প্রানবন্ত ও র্হৃদয়গ্রাহী করে তুলতে অবদান রাখে।

পর্যবেক্ষণঃ সফল অনুসন্ধানী প্রতিবেদন করতে হলে সরেজমিনে প্রত্যক্ষ পর্যবেক্ষণের কোনো বিকল্প নাই।পর্যবেক্ষণ অনুসন্ধানী সাংবাদিকতার প্রাণ এবং মূল ভিত্তি। যে কোনো দূরণীতি-অনিয়মের অনুসন্ধান করতে হলে পর্যবেক্ষণ অত্যন্ত জরুরি। বিষয়ের গভিরে যেতে হলে, রহস্য উন্মোচন করা, প্রকৃত অবস্থা অবলোকন করে অভিযোগের সত্যতা এবং পরিধি নিরুপণ করার নিমিত্তে পর্যবেক্ষণ অবশ্যম্ভাবী। এমন কি সাধারন দৈনন্দিন সাংবাদিকতায়ও পর্যবেক্ষণ জরুরি, সেখানে অনুসন্ধানী সাংবাদিকতায় সরেজমিন পর্যবেক্ষণের অনুপস্তিথি অনুসন্ধানের সমগ্র কাজকে শুধু দুরল করে দিতে পারে তাই না, এর ফলে অনুসন্ধানের সমগ্র কাজটাই অন্তরনিহিত ভুলের কারনে মারাত্মক ঝুঁকির মুখে পরতে পারে।আমাদের সেই জনপ্রিয় প্রবাদ নিশ্চয়ই মনে আছে, Seeing is believing. সরেজমিন পর্যবেক্ষণই পালতটে দিতে পারে একটি সমগ্র অনুসন্ধানী কাজের ধারনার প্রেক্ষাপট এবং দৃষ্টিভংগী।সরেজমিন পর্যবেক্ষণের ফলে প্রস্তাবিত অনুসন্ধানী প্রতিবেদনের মৌলিক পরিকল্পনায়ও পরিবর্তন আসতে পারে। So, get to the ground।                          

জরিপঃ কোনো কোনো ক্ষেত্রে জরিপ পদ্ধতি প্রয়োগ করেও অনুসন্ধানী সাংবাদিকতার কাজ এগিয়ে নেওয়া যায়। ক্ষতিগ্রস্ত ব্যাক্তিদের উপর কিংবা সংগঠিত ঘটনার একটি আদর্শ নমুনা ঠিক করে তার উপর জরিপ কার্যক্রম পরিচালনার মাধ্যমে প্রাপ্ত তথ্য, সাক্ষাৎকার, ছবি সংগ্রহ করে অনুসন্ধানী প্রতিবেদনের ভিত্তি রচনা করা যায়, অন্যান্য হাতিয়ার বা টুলসের সমন্বয়ে।

তথ্য অধিকার আইনঃ আগেই উল্লেখ করা হয়েছে হাতিয়ার বিবেচনায় অনুসন্ধানী সাংবাদিকতায় তথ্য অধিকার আইনের গুরুত্ব এবং কারযকারিতা। যে সকল নথি-পত্র একটি অনুসন্ধানী প্রতিবেদনের জন্য অনিবার্য্য, তা সংগ্রহের সবচে কারযকর মাধ্যম তথ্য অধিকার আইন। এ আইন প্রয়োগ করেই অন্য যে কোনো দাপ্তরিক, নিশ্চিত এবং নিরভুল তথ্য এবং নথি সংগ্রহ করার ক্ষেত্রে এই আইন সাংবাদিককে দারুনভাবে ক্ষমতায়িত করে এবং সুরক্ষা দেয়।          

 বিষয় ৩.৫: অনুসন্ধানী সাংবাদিকতায় তথ্য অধিকার আইনের গুরুত্ব, প্রয়োগ ও করণীয়

যে কোনো বিষয়ে অনুসন্ধানী সবাদিকতা পরিচালনা করতে গেলে, দাপ্তরিক দলিল, তথ্য বা নথি-পত্র বা ডকুমেন্ট অনুসন্ধানী কাজের জীবনধারা বা lifeline হিসাবে বিবেচনা করা হয়। সাধারণভাবে, অনেক সময় ব্যাক্তিগত বা অনানুষ্ঠানিক সূত্র থেকে প্রয়োজনীয় নথি-পত্র সংগ্রহ করা যায়। তবে অনেক ক্ষেত্রে, বড় কোনো দূর্ণীতি, জনগনের অর্থ আত্মসাত, গুরুতর মানবাধিকার লংঘনের ঘটনা, জাতিয় স্বার্থ লংঘন বা অন্যকোনো বড় ধরনের অনিয়ম কিংবা জনস্বার্থ বিরোধী কোনো ঘটনা সংগঠিত  হলে, সেক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় আনুষ্ঠানিক দাপ্তরিক দলিল, তথ্য ও নথি-পত্র সহজলভ্য হবার সম্ভাবনা থাকেনা। কেননা, এসব ক্ষেত্রে স্বাভাবিকভাবেই দুর্নীতি-অনিয়মের সহিত জড়িত ক্ষমতাবান ব্যাক্তিরা পদ্ধতিগতভাবে (systematically) সংশ্লিষট দলিল ও নথি-পত্র গোপন রাখে এবং তথ্যের অবাধ প্রকাশ ও প্রবাহ বাধাগ্রস্থ করে। এরকম বাস্তবতায়, অনুসন্ধানী সবাদিকতার কাজ সঠিকভাবে সম্পন্ন করতে প্রয়োজনীয় দলিল-দস্তাবেজ ও নথি-পত্র সংগ্রহের জন্য একজন সাংবাদিকের প্রধান আশ্রয় এবং শেষ  হাতিয়ার হয়ে ওঠে তথ্য অধিকার আইন।                         

অনুসন্ধানী সবাদিকতায় সংগ্রিহিত তথ্য এবং উদ্ঘটিত সত্য প্রমানের ভিত্তি হিসাবে দাপ্তরিক নথি-পত্র কিংবা Documentary evidence অতি গুরুত্বপূর্ণ। অনুসন্ধানী সবাদিকতায় দাপ্তরিক নথি-পত্র এবং অকাট্য তথ্য-প্রমান সংগ্রহের ক্ষেত্রে তথ্য অধিকার আইন একটি বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ হাতিয়ার এবং জনপ্রিয় মাধ্যাম বা উপায়।   অনুসন্ধানী সবাদিকতা এবং তথ্য অধিকার আইন—উভয়ের উদ্দেশ্যই জনস্বার্থ। সুতরাং, এ দুটি একে অন্যের পরিপূরক। 

অনুসন্ধানী সবাদিকতার যে কোনো পর্যায়ে প্রয়োজন অনুসারে একজন অনুসন্ধানী সবাদিক তথ্য অধিকার আইন প্রয়োগ করতে পারেন এবং তার কাজের জন্য তথ্য প্রাপ্তি নিশ্চিত করে অনুসন্ধানের কাজটি বেগবান করতে পারেন।   

অনুসন্ধানী সবাদিকতায় বেরিয়ে আসে তথ্য গোপন করার মাধ্যমে কিভাবে ক্ষমতাবান মহল ও প্রজাতন্ত্রের কতিপয় কর্মচারীরা পরস্পর যোগসাজসে আইন ও ক্ষমতার অপব্যাবহার করে অবৈধ সম্পদ গড়ে তোলে। অনুসন্ধানী সাংবাদিকতা এহেন কর্মকান্ড উন্মোচন বা uncover করে দূর্নীতিবাজ ব্যাক্তি বা মহলকে জনগনের নিকট জবাবদিহি বা answerable করতে বাধ্য করে। ক্ষমতাধর ব্যাক্তি ও মহল সবসময় দূর্নীতি, অনিয়ম, অপকর্ম এবং ক্ষমতার অপব্যাবহারের তথ্য আড়াল করে এবং লুকিয়ে রাখতে সদা তৎপর থাকে। এমতাবস্থায়, যথাযথ কর্তৃপক্ষের নিকট হতে নির্দিষ্ট তথ্য আদায় ও প্রকাশের লক্ষ্যে তথ্য অধিকার আইনের প্রয়োগ অনুসন্ধানী সাংবাদিকতার লক্ষ্য অর্জনে কার্যকরী ভূমিকা রাখতে পারে এবং অনুসন্ধানী সাংবাদিকতার কাজকে সহজ ও বেগবান করতে পারে।

তথ্য অধিকার আইনটি প্রয়োগের মাধ্যমে হাতে গোনা মাত্র দুইয়েকটি নির্দিষ্ট বিষয় বাদে রাষ্ট্র পরিচালনায়, রাষ্ট্রীয়, স্বায়ত্বশসিত, এবং বিদেশি অর্থায়নে পরিচালিত বেসরকারী প্রতিষ্ঠানের প্রায় সকল বিষয়ে একজন অনুসন্ধানী সাংবাদিক তথ্য চাওয়ার এবং প্রাপ্তির অধিকার রাখেন। আইনটি নাগরিককে সরাসরি এটি প্রয়োগ করার ক্ষমতা ও অধিকার দিয়েছে। অনুসন্ধানী সাংবাদিকতার যে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ কাজ, প্রাপ্ত তথ্যের নির্ভুলতা এবং সঠিকতা যাচাই করা, সেটা সম্পণ্ণ করতে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হাতিয়ার হতে পারে তথ্য অধিকার আইনের প্রয়োগ এবং এর মাধ্যমে প্রয়োজনীয় দাপ্তরিক নথি-পত্র সংগ্রহ করা।   

ফলে, সঠিকভাবে ও দক্ষতার সহিত এই আইন প্রয়োগের মাধ্যমে পেশাদার সাংবাদিক যেমন গুরুত্বপূর্ন কোন বিষয়ে জনস্বার্থে গভীর অনুসন্ধানী প্রতিবেদন সফল ও কার্যকরভাবে সম্পন্ন করতে পারেন, ঠিক তেমনিভাবে একজন সচেতন সক্রিয় নাগরিকও এ আইনটি প্রয়োগের মাধ্যমে সম্ভাব্য দূর্নীতির ঘটনা, অনিয়ম, বা আইনের শাসন উপেক্ষিত হওয়ার কোন ঘটনা উন্মোচনের ক্ষেত্রে জনস্বার্থে তথ্য প্রকাশে হুইচেল ব্লয়ারের ভূমিকা পালন করতে পারেন।

জাতীয় শুদ্ধাচার কৌশলের অঙ্গীকার পূরনের লক্ষ্যে, তথ্য অধিকার আইন প্রয়োগের মাধ্যমে অনুসন্ধানী সাংবাদিকতার কাজকে সহজ, সফল, গতিশিীল ও জোরদার করার ক্ষেত্রে এই আইনটির গুরুত্ব অপরিসীম, তা নির্দিধায় বলা যায়।

যথাযথ প্রক্রিয়ায় তথ্য অধিকার আইন প্রয়োগে তথ্য লাভে সফলতা আসে এবং এর ফলে নাগরিকের ক্ষমতায়ন হয়। যুগপুরাতন গোপনীয়তার সংস্কৃতির বিপরীতে এই আইনটি জনস্বার্থে এবং ব্যাক্তিগত প্রয়োজনে তথ্য লাভের একটি কার্যকর হাতিয়ার, মাধ্যম এবং তথ্য গোপন করা এবং গোপন রাখার যেকোনো অবস্থায়, একজন  তথ্যাকাংখি যেকোনো নাগরিকের জন্য আইনটি আশ্রয় এবং সুরক্ষাও বটে।

শেষ কথা হলো, সমাজে একটি উঁচুমানের অনুসন্ধানী সাংবাদিকতার কাজের প্রভাব গভীর এবং বিস্তৃ়ত। কাজেই, এর প্রভাবের সূত্রে আরো ফলো-আপ প্রতিবেদনের ক্ষেত্র সৃষ্টি হবে যা সম্পাদনের লক্ষ্যেও অনুসন্ধানী সাংবাদিক পুনরায় তথ্য অধিকার আইন প্রয়োগ করবেন।             

…………………………………

বিষয় ৩.৬: অনুসন্ধানী সাংবাদিকতার চ্যালেঞ্জসমূহ ও তা উত্তোরণের কৌশল

অনুসন্ধানী সাংবাদিকতা গুরুতর কোনো দুরনিতী-অনিয়ম বা জাতীয় স্বার্থ লঙ্ঘনের বিষয়ে একটি দীর্ঘ্যমেয়াদী, গবেষণামূলক, এবং পদ্ধতিগত এক বিশেষ পেশাদারী অনুসন্ধানী কাজ। সে কারনে, এ কাজ সম্পাদনের প্রক্রিয়ায় একজন অনুসন্ধানী সাংবাদিককে নানবিধ চ্যালেঞ্জ বা প্রতিবন্ধকতা মোকাবেলা করেই অনুসন্ধানী প্রতিবেদন প্রস্তত করতে হয়।

সাধারনভাবে, দীর্ঘ্য সময় লাগা, নিয়োগকারী সংগঠনের অনীহা, প্রয়োজনীয় অর্থের যোগানে অনিশ্চয়তা, তথ্যে প্রবেশগম্যতায় বাধা, তথ্য ও নথি-পত্র সংগ্রহে নানামুখি প্রতিবন্ধকতা, তথ্যানুসন্ধানে ও গবেষণা কাজে দীর্ঘ্য কঠোর পরিশ্রম করার প্রয়োজনীয়তা, ডিজিটাল সিকিউরিটি আইনের অপপ্রয়োগের ভয়, অনুসন্ধানী প্রতিবেদন করতে গেলে প্রভাবশালী মহলের হুমকি, অনুসন্ধানী সাংবাদিকের ব্যাক্তিগত নিরাপত্তার অভাব, প্রয়োজনীয় প্রশিখনের অভাব, এবং তথ্য অধিকার আইনের প্রয়োগ বিষয়ে ধারনার অভাব ইত্যাদি অনুসন্ধানী সাংবাদিকতার প্রধান প্রতিবন্ধকতা।

এ সকল প্রতিবন্ধকতা উত্তোরনের প্রধান একটি উপায় হতে পারে ভালো মানের অনুসন্ধানী সাংবাদিকতার প্রকল্প উপস্থাপন করে নিয়োগকারি প্রতিষঠানকে সময় ও আরথিক সহায়তা দিতে রাজী করানো। নাগরিক সমাজের সমরথন চাওয়া, প্রশিখন গ্রহন, অনুসন্ধানী সাংবাদিকতা উতসাহিত করে এমন প্রতিশঠানের গ্রান্টের আবেদন করা, তথ্য অধিকার আইন প্রয়োগের সক্ষমতা অর্জন করা এবং জনস্বারথ রক্ষায় অনুপ্রানীত হওয়ার মাধ্যমে উল্লেখিত প্রতিবন্ধকতা সমূহ উত্তরন করা জেতে পারে।

………………………………                                                

বিষয় ৩.৭: তথ্য অধিকার আইন ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের বিপরীতে রক্ষাকবচ। 

বাংলাদেশে তথ্য অধিকার আইন কার্যকর হবার প্রায় এক দশক পরে, ২০১৮ সালে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন প্রনয়নের পর হতেই এক গভীর আশংকা, প্রশ্ন, দ্বিধা বিশেষত  পেশাদার সাংবাদিকদের মনের আকাশ আচ্ছন্ন করে রেখেছে—তথ্য অধিকার আইন কি ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের বিপরীতে রক্ষাকবচ? ইতোমধ্যে, আমরা গত বছর পর্যন্ত এই আইনের আওতায় ৪৫৭টি মামলা দায়ের হতে দেখেছি যার মধ্যে ৭৫টি মামলা করা হয়েছে সাংবাদিকদের বিরুদধে।           

কতিপয় নিবর্তনমূলক ধারা সংযোজিত হবার প্রেক্ষিতে ২০১৮ সালে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন কার্য্যকর হবার পর থেকে বিভিন্ন শ্রেণী-পেশার মধ্যে সাংবাদিকরা তাদের পেশাগত দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে সবচে বেশী শংকায় পরেছেন এর সম্ভাব্য অপব্যাবহারের আশংকায়।

যদিও তথ্য প্রাপ্তির ক্ষেত্রে, তথ্য অধিকার আইনকে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের উপর প্রাধান্য দেয়া হয়েছে। ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের ৩ ধারায় বলা হয়েছে যে, তথ্য অধিকার বিষয়ের ক্ষেত্রে যদি তথ্য অধিকার আইনের কোনো বিধানাবলী ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের কোনো বিধানাবলীর সাথে সাংঘর্ষিক হয় বা অসামনযস্য হয়, সে ক্ষেত্রে তথ্য অধিকার আইনের বিধানাবলীর প্রাধান্য পাবে এবং কার্যকর থাকবে।

যে বিষয়টি অত্যন্ত লক্ষ্যনীয়, তা হলো ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন এবং শতাব্দী পুরাতন ঔপনিবেশিক আমলের দাপ্তরিক গোপনীয়তা আইনের (Official Secrets Act of 1923) মত বিতর্কিত এবং নিবর্তনমূলক আইন যতদিন বলবত থাকবে, ততদিন এর অপপ্রয়োগের সুযোগ ও সম্ভাবনাও থাকবে।     

ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন কার্যকর হবার পর থেকে আশংকা করা হচ্ছে যে আইনটির ১৭, ১৮, ৩২, ৩৩ ধারাগুলো অনুসন্ধানী সাংবাদিকতার পথ সংকুচিত করে দেবে। কেননা, সাংবাদিকরা যে প্রথাগতভাবে, অর্থাত অনানুষ্ঠানিক এবং সরাসরি ব্যাক্তিগত মানবীয় সূত্রের মাধ্যমে নথি-পত্র, তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহ করে, উল্লেখিত ধারাসমূহের কারনে এই প্রচলিত প্রথাগত চর্চা ব্যাহত হতে পারে। কারন, এসকল ধারার আলোকে তথ্য সরবরাহকারি সূত্র এবং সাংবাদিক উভয়েই দোষী সাব্যস্ত হতে পারেন।

ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের এসকল ধারায় কোনো তথ্য ভান্ডার বা তথ্য কাঠামোতে অনঅনুমোদিত প্রবেশকে অপরাধ হিসাবে সংগায়িত করা হয়েছে। সে কারনে, সম্ভাব্য কোনো আইনী জটিলতা এড়াতে তথ্য অধিকার আইনের ব্যাবহার করে তথ্য সংগ্রহ করা একজন সাংবাদিকের জন্য আইনী সুরক্ষা দিতে পারে।

তবে, ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের যে ধারাটি অনুসন্ধানী সাংবাদিকতার ক্ষেত্রে সবচেয়ে বেশী দুশচিন্তার কারন সেটি হলো ধারা ৩২। এ ধারায় বলা হয়েছে যে কোনো ব্যাক্তি যদি দাপ্তরিক গোপনীয়তা আইন (Officia Secrets Act) এর আওতায় কোনো অপরাধ কম্পিউটার, ডিজিটাল ডিভাইস, কম্পিউটার নেটওয়ার্ক, ডিজিটাল নেটওয়ার্ক, অথবা অন্যকোনো ডিজিটাল মাধ্যমে সংগঠিত করেন বা করতে সহায়তা করেন, তাহলে তিনি অনধিক ১৪ বছর কারাদন্ডে অথবা ২৫ লক্ষ টাকা অর্থদন্ডে অথবা উভয় দন্ডে দন্ডিত হবেন।                           

আবার, সম্প্রতি পেশাগত দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে সাংবাদিক রোজিনা ইসলামের বিরুদ্ধে দাপ্তরিক গোপনীয়তা আইনে মামলা হবার ঘটনার প্রেক্ষিতে সাংবাদিকদের মধ্যে সাধারনভাবে দাপ্তরিক গোপনীয়তা আইন এবং ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের অপপ্রয়োগের আশংকা বেড়ে গেছে।

সুতরাং, এ সকল আশংকার প্রেখাপটে তথ্য সংগ্রহে তথ্য অধিকার আইনের প্রাধান্য কাজে লাগিয়ে সাংবাদিক নিরাপদে তথ্য সংগ্রহ করতে পারেন।