তথ্য অধিকার আইন

ভূমিকা ও উদ্দেশ্য: 

‘তথ্য অধিকার’ অন্যান্য সমস্ত অধিকারের মূলচাবিকাঠি। গণতন্ত্রে যাদের ক্ষমতার অধিকারী হওয়া উচিত তাদের কার্যকরভাবে ক্ষমতায়ন করার পক্ষে তথ্য অধিকার আইন অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ হাতিয়ার। এই আইন ব্যবহার করে গণমাধ্যম – প্রিন্ট ও ইলেকট্রনিক – উভয়ই মানুষের অধিকার নিশ্চিত করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে।

বাংলাদেশ বিশ্বের ৮৮তম দেশ, যেখানে তথ্য অধিকার আইন কার্যকর রয়েছে। আইনটির যথাযথ প্রয়োগ স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা ও সুশাসনের ভিত্তিতে দেশ পরিচালনায় ভূমিকা রাখতে পারে এবং নীতি নির্ধারণে জনগণের অংশগ্রহণ বৃদ্ধি করতে পারে। কিন্তু একদশকের অধিককাল অতিক্রান্ত হলেও, আমাদের দেশে এই আইন ব্যবহারের উল্লেখযোগ্য প্রসার ঘটেনি। জনগণের মধ্যে খুবই নগন্য একটি অংশ আছেন, যারা আইনটি সম্পর্ক শুনেছেন। আর যারা শুনেছেন, তাদের মধ্যে খুব কমই আছেন, যারা এই আইন প্রয়োগ করেছেন। অথচ পাশ্ববর্তী দেশ ভারতে তথ্য অধিকার আইন প্রয়োগের উল্লেখযোগ্য সফলতা দৃশ্যমান।

তথ্য অধিকার আইনটি মূলত জনগণের কল্যাণে জনগণের ব্যবহারে জন্য। আর সাংবাদিকতার নৈতিকতার মধ্যে নিহিত রয়েছে জনকল্যাণে জন্য সত্যের অনুসন্ধান ও বস্তুনিষ্ঠ সংবাদ পরিবেশন। তাই আইনটি আপনাদের জন্যও সমভাবে কার্যকর। যদিও দৈনন্দিন প্রতিবেদন বা সংবাদ তৈরিতে এই আইন আপনাদের কোনভাবে সাহায্য করবে না হয়তো, কিন্তু দীর্ঘ  মেয়াদী ও পরিকল্পিতভাবে অনুসন্ধানী প্রতিবেদন তৈরিতে এই আইন আপনাদের ব্যাপক এবং নানাভাবে সহযোগীতা করতে পারে। তাছাড়া, নাগরিক তথ্য চেয়ে পাবে বা পাবে না কিংবা তথ্য পেলে কি ধরনের তথ্য পেল এই বিষয়টিও আপনাদের প্রতিবেদনের বা সংবাদের বিষয়বস্তু হতে পারে। এই আইনটির মাধ্যমে প্রাপ্ত তথ্য-প্রমাণ আপনাদের পেশাদারিত্ব বৃদ্ধিতে এবং আপনাদের  সুরক্ষিত রাখতে ভূমিকা পালন করতে পারে। 

এই মডিউলে আপনারা ‘তথ্য অধিকার আইন ২০০৯’  কীভাবে ত্রুটিমুক্ত ও দক্ষতার সাথে ব্যবহার করে তথ্য অনুসন্ধান করতে পারেন তার প্রয়োগ ও পদ্ধতি তুলে ধরা হয়েছে। আপনারা পারেন জনগণের হয়ে এই আইনের সবলদিকগুলি ব্যবহার করে দুর্নীতি, অনিয়ম, অন্যায্যতা ও বঞ্চনার সংবাদ তুলে ধরে জাতীয় শুদ্ধাচার কৌশল বাস্তবায়নকে ত্বরান্বিত করতে।

এই মডিউলে অংশগ্রহণ শেষে, আপনারা-

  • অবাধ তথ্য প্রবাহ ও নাগরিকের তথ্যে প্রবেশাধিকার গুরুত্ব ও  গণতন্ত্র সুসংহতকরণ, সুশাসন প্রতিষ্ঠা এবং জাতীয় শুদ্ধাচার কৌশল বাস্তবায়নে তথ্যের ভূমিকা ব্যাখ্যা করতে পারবেন;
  • তথ্য অধিকার আইনের গুরুত্ব, পটভূমি ও স্বীকৃতি বর্ণনাকরতে পারবেন;
  • তথ্য অধিকার আইন’র বিধি-বিধান এবং এর প্রয়োগিক দিক ব্যাখ্যা বিশ্লেষণ করতে পারবেন;
  • তথ্য সংগ্রহ করার ক্ষেত্রে প্রশ্ন তৈরির কৌশল, আবেদন তৈরি ও তা দায়েরের দক্ষতা অর্জন করতে পারবেন;
  • তথ্য অধিকার আইন প্রয়োগের চ্যালেঞ্জসমূহ এবং তা মোকাবেলার কৌশল বর্ণনা করতে পারবেন।

আলোচ্য বিষয় ২.১: সুশাসন প্রতিষ্ঠায় এবং জাতীয় শুদ্ধাচার কৌশল  বাস্তবায়নে তথ্যে প্রবেশাধিকারের গুরুত্ব

তথ্য অধিকার কী?

যেসব তথ্য সাধারণ নাগরিকের রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক এবং সামাজিক অধিকার অর্জনে সহায়ক, যেগুলির অভাবে এই অধিকার গুলি অজর্ন প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি হয়, নাগরিকের রাষ্ট্রীয় সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ায় অংশগ্রহণ বাধাগ্রস্থ হয়, সেইসব তথ্য পাওয়ার অধিকারকে সাধারণভাবে তথ্য অধিকার বলা হয়। তথ্য অধিকারের ক্ষেত্র তৈরী হয় মূলত: তথ্য গোপন করার নানা রকম আইনী ও বেআইনী আয়োজনের কারণে।

তথ্যে প্রবেশাধিকারের কেন গুরুত্বপূর্ণ?

জনগণের জ্ঞান বর্ধন ও ক্ষমতায়ন

তথ্যই ক্ষমতা। তথ্য জনগণের জ্ঞান-বুদ্ধি বৃদ্ধি করে। জ্ঞান জনগণকে সঠিক পথে পরিচালিত করে ও সুন্দর ভবিষ্যৎ নির্মাণে ভূমিকা রাখে। দৈনন্দিন জীবনে মানুষ নানা সিদ্ধান্ত নেয়। মানুষকে সামাজিক, অর্থনেতিক, রাজনৈতিক এবং সাংস্কৃতিক পরিসরে বহু সিদ্ধান্ত নিতে হয়। আর সিদ্ধান্তের জন্য প্রয়োজন তথ্য। সঠিক তথ্য সঠিক সিদ্ধান্তের সহায়ক। 

তথ্য মনোবল বাড়ায়। তথ্য মানুষকে ক্ষমতায়িত করে। সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ায় অংশগ্রহণের সাহস যোগায়। আলোচনায় সোচ্চার ভূমিকা রাখতে সক্ষম করে তুলে। তথ্য জনগণকে শোষণ ও বঞ্চনা থেকে রক্ষা পেতে সহায়তা করে। 

একটি প্রকৃত কল্যাণমূলক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার জন্য প্রয়োজন জনগণের ক্ষমতায়ন। জনগণের ক্ষমতায়ন নিশ্চিত করতে রাষ্ট্রে জনগণের মালিকানা প্রতিষ্ঠা করতে হবে। তথ্যে নাগরিকের প্রবেশাধিকার নিশ্চিত হলে রাষ্ট্রে জনগণের মালিকানা সুপ্রতিষ্ঠিত হয়, জনগণের ক্ষমতায়ন সুনিশ্চিত হয়। 

নাগরিকের ন্যায্য অধিকার আদায়

জনগণের জানার অধিকার রয়েছে সরকার সম্পর্কে, সরকারের দায়িত্ব, নাগরিক হিসেবে তাদের অধিকার সম্পর্কে, সরকারী সেবা ও সুবিধা পাওয়ার অধিকার সম্পর্কে। জনগণের অধিকার সচেতনতার মাধ্যমে অধিকার আদায় করতে, তাদের উন্নয়ন প্রক্রিয়ায় অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে, জেন্ডার সমতা প্রতিষ্ঠা করতে জানার অধিকার নিশ্চিত করা প্রয়োজন। জাতীয় ও স্থানীয় সরকারের কার্যক্রম, প্রদত্ত সেবাসমূহ, এলাকার জন্য সম্পদ বরাদ্দের পরিমাণ সম্পর্কে তথ্য চাওয়ার অধিকার থাকলে জনগণ তাদের প্রাপ্য আদায়ে নিশ্চিন্তভাবে অগ্রসর হতে পারে। যে আইন জনগণের নিরাপত্তা, অধিকার আদায় ও সুরক্ষার জন্য প্রণীত, সেইসব আইন সম্পর্কে জনগণের জানা থাকলে সরকারী ও বেসরকারী সেবাপ্রদানকারী সংস্থা, আইনপ্রয়োগকারী সংস্থার ক্ষমতার অপব্যবহার ও জনগণকে বঞ্চিত করার সুযোগ অনেক কমে আসতে পারে।

সুশাসন প্রতিষ্ঠা

জাতীয় শুদ্ধাচার কৌশলের ভিশন – সোনার বংলা গড়ার জন্য জন্য প্রয়োজন সুশাসন। সুশাসনের সূচক সমূহের সাথে তথ্য প্রবেশাধিকারের সম্পর্ক রয়েছে। জনগণের নিরাপত্তা বিধান, নাগরিকের রাস্ট্রীয় সিদ্ধান্ত গ্রহণে অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা, দেশের উন্নয়নে জনগণের সম্পদের সর্বোত্তম ব্যবহার, নাগরিকের মৌলিক অধিকার সমূহকে নিশ্চিত করা, সরকারী কার্যক্রমে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা সুশাসনের গুরুত্বপূর্ণ উপাদান। তথ্য প্রবেশাধিকার নিশ্চিত হলে সুশাসনের ক্ষেত্রে ইতিবাচক প্রভাব পড়ে, দুর্নীতি হ্রাস পায় এবং জনগণের জীবনযাত্রার মান বাড়ে।

জবাবদিহিতা ও স্বচ্ছতা 

সুশাসনের অন্যতম প্রথম শর্ত হচ্ছে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা। একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের সকল কর্মকাণ্ড পরিচালিত হয় জনগণের সর্বোচ্চ কল্যাণ সাধনের জন্য। এই কর্মকাণ্ড সঠিকভাবে পরিচালনার জন্য জনগণ তার প্রতিনিধি নির্বাচন করে, যারা একটি সংগঠিত কাঠামোর মধ্যে জণগণের সেবা করে। যাকে আমরা সরকার বলি। সরকারি তহবিল থেকে রাষ্ট্রের সকল ব্যয় নির্বাহ করা হয়। সরকারি এই তহবিল গঠিত হয় জনগণে করের টাকায় বা জনগণের/দেশের নামে নিয়ে আসা ঋণ বা অনুদানে টাকায়। তাই সরকারি তহবিলের প্রতিটি টাকা জনগণের টাকা। যেহেতু দেশের সকল কর্মকাণ্ড পরিচালিত হয় জনগণের কল্যাণে এবং দেশের সকল কর্মকান্ডের ব্যয নির্বাহ হয় জনগণের টাকায়, সেহেতু জনগণের কাছে রাষ্ট্র ও রাষ্ট্রের সকল প্রতিষ্ঠানের সকল কর্মকাণ্ডের স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত হতে হবে।

জবাবদিহিতার সবচেয়ে সহজ উপায় হল প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রম সংক্রান্ত তথ্য প্রকাশ করা। নাগরিক যাতে সহজে প্রয়োজনীয় তথ্য পায়। কিন্তু বাস্তবে দেখা যায়, রাষ্ট্রীয় গোপনীয়তার নামে সরকারের অধিকাংশ দপ্তরের কার্যক্রম ও কার্যপদ্ধতি সংক্রান্ত তথ্য প্রকাশ করা হয় না, যার ফলে দুর্নীতির সুযোগ অনকে বেড়ে যায়।

আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা

সুশাসন ন্যায্য নিরপেক্ষ বিচার ব্যবস্থার অপর পিঠ। সরকার, বিচারব্যবস্থা ও জনপ্রতিধিত্বমূলক সংস্থা নিয়মনীতির মধ্যে পরিচলিত না হলে নাগরিক অধিকার খর্ব হয়, দুর্নীতি শেকড় গেড়ে বসে, জনগণের ক্ষমতা ব্যক্তিবিশেষের স্বার্থে ব্যবহৃত হয়। সরকার যখন আইনের উর্ধে থাকে তখন জনগণ আইন মেনে চলতে অনীহা প্রকাশ করে এবং অরাজক পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়। জনগণের তথ্যে প্রবেশাধিকার আইন প্রয়োগকারী ও আইনমান্যকারী উভয়কে সচেতন করে এবং আইনের শাসন উন্নতকরণে ভূমিকা রাখে।

উন্নয়ন ত্বরান্বিতকরণ

দুস্থ ভাতা, বয়স্ক ভাতা, প্রতিবন্ধী ভাতা, দরিদ্র মানুষের জন্য বিনামূল্যে খাদ্য বিতরণ কর্মসূচী (ভিজিডি, ভিজিএফ কার্ড), কৃষি ভর্তুকী, গুণগত মানসম্পন্ন ও সুলভ শিক্ষা, প্রযুক্তি তথ্য, কার্যকর ও সুলভ স্বস্থ্যসেবা, মানবাধিকার প্রতিষ্ঠা ও সুবিচার পাওয়ার জন্য প্রয়োজনীয় তথ্য প্রবাহের আয়োজন অত্যন্ত জরুরি। তথ্যপ্রাপ্তির সুযোগের অভাব দরিদ্য মানুষের অসহায়ত্ব ও ক্ষমতায়নের অভাবের অন্যতম কারণ। বাজার তথ্যের অভাবে একজন কৃষক মধ্যস্বত্বভোগীর দৌরাত্মর শিকার, স্বাস্থ্যসেবার তথ্যের অভাবে প্রতিরোধযোগ্য রোগের শিকার, আইন সহায়তা সেবার অভাবে সুবিচার পাওয়ার অধিকার থেকে বঞ্চিত। যারা এইসব তথ্য পেতে চান, তাদের উৎকোচের শিকার হতে হয়, কেননা অনেক ক্ষেত্রে তারা জানেনা যে এগুলি পেতে কোন অর্থ প্রদানের বিধান নেই। তাই সাধারণ জনগণের তথ্যে প্রবেশাধিকার উন্নয়নের পথকে সহজতর করে এবং সেবা সরবরাহকারী ও সেবা গ্রহণকারীর মধ্যে আস্থার সম্পর্ক সৃষ্টি করে।

আলোচ্য বিষয় ২.২: তথ্য অধিকার আইন: প্রেক্ষাপট, স্বীকৃতি ও গুরত্ব 

তথ্য অধিকার আইন প্রবর্তন কেন প্রয়োজন হয়ে পড়ল?

জনগণ জানুক এবং প্রশ্ন করুক এটি সাধারণত শাসকরা পছন্দ করেন না। জনগণকে যতবেশি অজ্ঞ রাখা যাবে, ততবেশি অন্যায় শাসন ও শোষণ অব্যাহত রাখা সহজ হয়। ব্রিটিশ শাসনামলে ঔপনিবেশিক সরকারও জণগণের ওপর শাসন ও শোষণ – এ দুই অব্যাহত রাখার জন্য কখনোই চাইতেন না জনগণ সরকারি কার্য সম্পর্কে গভীরভাবে জানুক, প্রশ্ন করুক বা অংশগ্রহণ করুক। কেবল তাই নয়, তারা জনগণের জানার ও প্রশ্ন করার অধিকার বঞ্চনাকে আইনগত বৈধতা দিলেন ‘দি অফিসিয়াল সিক্রেটস এ্যাক্ট ১৯২৩’ প্রণয়নের মধ্য দিয়ে। সরকারি কর্মকর্তারা যাতে জনগণের সাথে কোন তথ্য বিনিময় করতে না পারেন তার জন্য তারা এই আইন প্রণয়ন করলেন। অফিসিয়াল গোপনী বিষয় সংরক্ষণের নামে এই আইনকে সার্বিক তথ্য গোপনের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার শুরু করলেন। গড়ে ওঠে তথ্য গোপনের সংস্কৃতি। ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসন অবসানের হলো, মহান মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে পাকিস্তানী শাসনের অবসান হলো, গড়ে উঠলো নয়া বাংলাদেশ- গণপ্রজাতান্ত্রিক বাংলাদেশ, যার সংবিধানে বলা আছে ‘সকল ক্ষমতার মালিক জনগণ’। সেদেশে তথ্য গোপনের নিমিত্তে ৯৭ বছররে পুরনো ‘দি অফিসিয়াল সিক্রেটস এ্যাক্ট ১৯২৩’ এখনও বহাল রয়েছে। আরও রয়েছে সরকারি কর্মকর্তাদের আচরণবিধি ‘রুলস অব বিজনেস ১৯৯৬’ এবং ‘গভর্নমেন্ট সার্ভন্টেস কনডাক্ট রুলস ১৯৭৬’। 

এই আইনগুলির অজুহাত দিয়ে জনগণ এমনকি সাংবাদিকরাদেরও  বহু বছর সাধারণ তথ্য দিতে গড়িমসি করেছে সরকারি কর্মকর্তারা। কিন্তু কোন তথ্য দেয়া যাবে, কোন তথ্য দেয়া যাবে না এ ব্যাপারে কোন সুনির্দিষ্ট দিক নির্দেশনা ছিল না। 

অথচ বাংলাদেশ স্বাধীনতার অব্যবহিত পরে ১৯৭২ সালে জাতিসংঘের মানবাধিকার সনদে, স্বাক্ষর করে। এই মানবাধিকার সনদের ১৯ নম্বর ধারায় বলা আছে, “ প্রত্যেকেরই মতামত পোষণ ও মতামত প্রকাশের অধিকার রয়েছে; বিনা হস্তক্ষেপে মতামত পোষণ এবং রাষ্ট্রীয় সীমানা নির্বশেষে যেকোনো মাধ্যমে তথ্য ও মতামত অন্বেষণ, গ্রহণ ও জ্ঞাত করার স্বাধীনতা এ অধিকারের অন্তর্ভূক্ত”।  আর জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের রেজুলেশন ৫৯ (১) “তথ্য অধিকার হলো একটি অন্যতম মৌলিক মানবাধিকার যা জাতিসংঘ কর্তক গৃহীত অপরাপর অধিকার অর্জনের পরশপাথর স্বরূপ”। এসব দলিলে স্পষ্টভাবে মতপ্রকাশে স্বাধীনতার অধিকারের কথা বলা হয়েছে। এই অধিকারের আওতায় শুধু মত প্রকাশ করা নয়,গণমাধ্যমের মাধ্যমে যেকোন তথ্য ও ধারণা জানার, গ্রহণ করার এবং ছড়িয়ে দেয়ার অধিকারের কথা বলা হয়েছে। একই অধিকারের কথা ১৯৬৬ সালের নাগরিক ও রাজনৈতিক অধিকার সংক্রান্ত আন্তর্জাতিক চুক্তিপত্রেও ( International Covenant on Civil and Political Rights-ICCPR) উল্লেখ রয়েছে। এই আন্তর্জাতিক চুক্তিপত্রেও বাংলাদেশ ২০০০ সালে স্বাক্ষর করে। এছাড়াও, বাংলাদেশ মানবাধিকার ও মৌলিক স্বাধীনতাসংক্রান্ত ইউরোপীয় চুক্তিপত্রে (European Covenant on Human Rights and Fundamental Freedoms – EHR) এবং মানবাধিকার সংক্রান্ত মার্কিন চুক্তিপত্রে (American Covenant on Human Rights) স্বাক্ষরকারী দেশ। এসব আন্তর্জাতিক দলিলে স্বাক্ষরকারী দেশ হিসেবে সরকারের জনগণের কাছে সব ধরণের তথ্য উন্মুক্ত করার বাধ্যবাধকতা তৈরি হয়।

আমাদের সংবিধানে সরাসরি তথ্য অধিকার বা তথ্যে প্রবেশাধিকারকে অধিকার হিসেবে ঘোষণা না করলেও সংবিধানের ৭ ও ১১ অনুচ্ছেদে জনগণের জানার ও মতপ্রকাশের অধিকারকে স্বীকার করা হয়েছে। ৭ অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, ‘প্রজাতন্ত্রের সকল ক্ষমতার মালিক জনগণ; এবং জনগণের পক্ষে সেই ক্ষমতার প্রয়োগ কেবল এই সংবিধানের অধীন ও কর্তৃত্বে কার্যকর হইবে’। এর অর্থ হলো রাষ্ট ও রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানসমূহ জনগণের কাছে দায়বদ্ধ। জনগণের এই ক্ষমতাকে সুরক্ষা দেবে এসব প্রতিষ্ঠান সম্পর্কে তার তথ্য জানার অধিকারের আইন। সংবিধান জনগণের এই অধিকারকেও স্বীকৃতি দিয়েছে। একইভাবে ১১ অনুচ্ছেদে মৌলিক মানবাধিকার ও স্বাধীনতার নিশ্চয়তা দেয়া হয়েছে যা ব্যক্তিস্বাধীনতা, মানুষের মর্যাদা ও জীবনের অধিকারকে সম্মান দেয়ার কথা ঘোষণা করেছে।

তাছাড়া আশির দশকে স্বৈরচার বিরোধী আন্দোলন এবং নব্বই দশেকে গণতান্ত্রিক ধারার পুনপ্রবর্তনের মধ্য দিয়ে জনগণের মধ্যে সুশাসন প্রতিষ্ঠার এবং রাষ্ট্র ও রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানসমূহের স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতার চাহিদা ক্রমশ: বৃদ্ধি পেতে থাকে। ২০০০ সাল এসে জনগণের এই আকাঙ্খাকে পূঁজি করে নাগরিক সমাজ ও গণমাধ্যম ক্রমাগত তথ্য অধিকার আইন প্রচলন ব্যাপারে সোচ্চার হয়ে উঠে।

সুতরাং তথ্য উন্মুক্ত করার একদিকে আন্তর্জাতিক চুক্তিসমূহের বাধ্যবাধকতা, অন্যদিকে সাংবিধানিক স্বীকৃতি ও চেতনা এবং নাগরিক সমাজসহ জনগণের জোরালো চাহিদার পরিপ্রেক্ষিতে তথ্য অধিকার আইন প্রবর্তন করার প্রয়োজন হয়ে পড়ে।

দেশে দেশে তথ্য অধিকার আইন

বিশ্বে সর্বপ্রথম ১৭৬৬ সালে সুইডেনে আইন পাসের মধ্য দিয়ে সরকারি তথ্যে জনগণের প্রবেশাধিকারে নিশ্চিত করার আনুষ্ঠানিক যাত্রা শুরু হয়। সুইডেনে আইন পাসের ১২২ বছর পর, ১৮৮৮ সালে দ্বিতীয় দেশ কলম্বিয়ায় তথ্য অধিকার আইন পাস হয়। তারপর থেকে ধীর গতিতে এই ধরনের স্বচ্ছতা আইন এগিয়ে চলে। যেমন, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে Freedom of Information (FOI) আইন প্রণীত হয় দু’শ বছর পর ১৯৬৬ সালে। এরপর ১৯৮৯ সাল পর্যন্ত সময়কালে ইউরোপ ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের ১৩টি দেশে তথ্যের স্বাধীনতা আইন পাস হয়। বর্তমান বিশ্বে সর্বশেষ ১৩০টি দেশে ‘তথ্য অধিকার আইন’ বা ‘মুক্ত তথ্য আইন’ বলবৎ রয়েছে।

তথ্য অধিকার আইন সারা বিশ্বে নানা নামে পরিচিত। যেমন, Access to Information (ATI) যাকে বাংলায় বলা যায় ‘ সরকারি তথ্য-ভান্ডারে প্রবেশের আইন’, Transparency Law বা স্বচ্ছতা আইন, ‍Sunshine Law বা ‘সূর্যালোক আইন, Open Government Law বা উন্মুক্ত সরকার আইন। তথ্য অধিকার আইনকে সূর্যালোক আইন বলা হয় এই কারণে যে, আইনটির উদ্দেশ্য হচ্ছে সরকারী তথ্যের ওপর থেকে গোপনীয়তার অন্ধকার দূর করার জন্য তার ওপর সূর্যর আলো বর্ষণ করা।

দক্ষিণ এশিয়ার ‘সার্ক’ অঞ্চলের অন্যান্য দেশগুলোর মধ্যে পাকিস্তানে আইনটি সংক্ষিপ্ত আকারে অধ্যাদেশ হিসেবে চালু হয় ২০০১ সালে। বর্তমানে দেশিটিতে আইনটি হালনাগাদ করে জাতীয়-সংসদ প্রণীত আইন হিসেবে পাশ করার চেষ্টা চলছে। তবে পাকিস্তানের বিভিন্ন প্রদেশে আইনটি ইতিমধ্যে চালু হয়েছে। নেপালে তথ্য অধিকার আইন পাস হয় ২০০৭ সালে, মালদ্বীপ ও আফগানিস্তানে ২০১৪ সালে ও শ্রীলঙ্কায় ২০১৬। সবমিলে ৭টি সার্কভূক্ত দেশে আইনটি প্রনীত হয়েছে। ভুটানে আইনটি এখনো প্রক্রিয়াধীন।

আমাদের প্রতিবেশী দেশ ভারতে আইনটি পাশ হয় ২০০৫ সালে। এ অল্প সময়ের মধ্যে দেশটিতে আইনটির সফলতা অনেক। সারা ভারতব্যাপী এখন অনেক তথ্য কর্মী। এই তথ্য কর্মীরা কর্তৃপক্ষের কাছে লক্ষ লক্ষ আবেদন করতে সাধারণ জনগণকে সহায়তা করছে। সেখানে অল্প সময়ে এত বেশি আবেদন পড়েছে, যে কারণে সরকারি অফিসগুলি অনেক সতর্ক ও সচেতন এবং আগে তারা যেসব তথ্য গোপন করত এখন তার আনেকটাই তারা স্ব-প্রণোদিত হয়ে তাদের ওয়েবসাইটে প্রকাশ করছে।

বাংলাদেশে তথ্য অধিকার আইন

৮৮ তম দেশে হিসেবে বাংলাদেশে ২০০৯ সালে নতুন সরকার নবগঠিত জাতীয় সংসদের মাধ্যমে ২৯ মার্চ ‘ তথ্য অধিকার আইন ২০০৯’ পাশ করে। এই আইনে ৫ ই এপ্রিল রাষ্ট্রপতি বিলে সম্মতি দেন এবং ৬ এপ্রিল আইনটি গেজেট আকারে প্রকাশিত হয়। ১ লা জুলাই থেকে আইনটি পুরোপুরি কার্যকর হয়। আর এই আইন বাস্তবায়নের লক্ষ্যে ১ জুলাই গঠন করা হয় তথ্য কমিশন।

তথ্যের অবাধ প্রবাহ এবং জনগণের তথ্য অধিকার নিশ্চিতকরণের লক্ষ্যে প্রণীত হয়েছে তথ্য অধিকার আইন। আইনের প্রস্তাবনায় এই আইন প্রণয়নের উদ্দেশ্য স্পষ্টভাবে তুলে ধরা হয়েছে। প্রস্তাবনায় যা বলা আছে তা সংক্ষেপে তুলে ধরা হলো।-

  • গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের সংবিধানে চিন্তা, বিবেক ও বাক-স্বাধীনতা নাগরিকদের অন্যতম মৌলিক অধিকার হিসেবে স্বীকৃত। অতএব, নাগরিকের তথ্য জানার অধিকার প্রতিষ্ঠিত হলে তার চিন্তা, বিবেক ও বাকস্বাধীনতার অধিকার প্রতিষ্ঠিত হবে।
  • যেহেতু জনগণ রাষ্ট্রের সকল ক্ষমতার মালিক; সেহেতু তথ্য অধিকার প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে জনগণের ক্ষমতায়ন নিশ্চিত হবে
  • জনগণের তথ্য জানার অধিকার নিশ্চিত হলে সরকারি, স্বায়ত্তশাসিত ও সংবিধিবদ্ধ সংস্থা এবং বিদেশী অর্থায়নে পরিচালিত বেসরকারি সংস্থাসমূহের স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা বৃদ্ধি পাবে, দুর্নীতি হ্রাস পাবে এবং সুশাসন প্রতিষ্ঠিত হবে।

আইনের এই উদ্দেশ্যের প্রেক্ষিতে বলা যায়, বাংলাদেশ সরকার এই আইনের মাধ্যমে জনগণের স্বার্থ পরিচালিত সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের কাজে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা প্রতিষ্ঠা করতে, দুর্নীতি কমাতে ও সুশাসন স্থাপন করতে অঙ্গীকারাব্ধ।

সরকারের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গীকার ‘জাতীয় শুদ্ধাচার কৌশল’ বাস্তবায়নের সাথেও আইনটি কার্যকর করার বিষয়টি যুক্ত। কারণ জাতীয় শুদ্ধাচার কৌশলের অন্যতম লক্ষ্য হলো দুর্নীতিমুক্ত বাংলাদেশ গড়ে তোলা। তথ্য অধিকার আইন স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতার বৃদ্ধি ও দুর্নীতি হ্রসের একটি গুরুত্বপূর্ণ হাতিয়ার। 

তাছাড়া, তথ্য অধিকার আইনের বাস্তবায়নের ব্যাপারে সরকারের আরো একটি বিশেষ পদক্ষেপ হচ্ছে, ২০১৫ সালে জাতিসংঘ কর্তৃক গৃহীত Sustainable Development Goals (SDGs) ২০৩০ সালের মধ্যে বাস্তবায়নের অঙ্গীকার। আর তাতে তথ্য অধিকার আইনকে অন্তর্ভূক্ত করা হয়েছে ও সঠিকভাবে কার্যকর করার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে।

সাংবাদিকরা মুলত সমাজের বিভিন্ন সমস্যা এবং নানা রকম দুর্নীতি ও অঙ্গতি তুলে ধরতে চান। সামাজিক দায়বদ্ধতা ও সবরকমের নির্যাতন নিপীড়ন এবং শোষণ-বঞ্চনার বিরুদ্ধে দাঁড়ানোর একটা অঙ্গীকার কাজ করে সাংবাদিকদের মধ্যে। তথ্য অধিকার আইন ব্যাপকভাবে প্রয়োগের মাধ্যমে সাংবাদিকদের এই অঙ্গীকার নিয়ে কাজ করার অনেক সুযোগ রয়েছে।

এই আইন নিশ্চিত করেছে – 

  • নাগরিক তার প্রয়োজনে যেকোন তথ্য নির্দিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে আবেদনের মাধ্যমে চাইতে পারে;
  • আইনে, ধারা ৭’র আওতাবহির্ভূত সকল তথ্য নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে প্রদানের জন্য সকল কর্তৃপক্ষকে নির্দেশ দেয়া হয়েছে
  • তথ্য সরবরাহের কাজ সহজতর এবং দ্রুতসময়ের মধ্যে সম্পন্ন করার জন্য যথাযথ তথ্য সংরক্ষণ ব্যবস্থাপনার ওপর জোর দেয়া হয়েছে
  • আইনের লঙ্ঘনের জন্য রয়েছে জরিমানা ও শাস্তির বিধান। 

আলোচ্য বিষয় ২.৩:তথ্য অধিকার আইনের আওতায় ‘তথ্য’, তথ্য প্রদানকারী কর্তৃপক্ষ ও তথ্য প্রাপ্তির প্রক্রিয়া

তথ্য অধিকার আইন ২০০৯’র সংজ্ঞা

বাংলাদেশের সংবিধান ৭ (ক) অনুচ্ছেদে বলা আছে- রাষ্ট্রের সকল ক্ষমতার মালিক জনগণ। তাই সরকারের কাছে যে তথ্য আছে সেটার মালিকও জনগণ। সরকার তার কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে যেসব তথ্য সংগ্রহ করে বা তৈরি করে  জনগণের সেই তথ্য জানার অধিকার রয়েছে। কারণ জনগণের করের অর্থ কাজে লাগিয়ে, জনগণের উন্নতি বা মঙ্গলের জন্যই সরকার কাজ করে। আর এই ধারণা থেকে এসেছে তথ্য জানার অধিকার।

তথ্য অধিকার কী

যেসব তথ্য সাধারণ নাগরিকের রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সামাজিক অধিকার অর্জনে সহায়ক, যার অভাবে এই অধিকারগুলি অর্জন করা কঠিন হয়ে পড়ে, রাষ্ট্রীয় সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ায় নাগরিক নিরবিচ্ছিন্নভাবে বা বাধাহীনভাবে অংশ নিতে পারে না, সেসব তথ্য পাওয়ার অধিকারকে সাধারণভাবে তথ্য অধিকার বলে।

তথ্য অধিকার আইন ২০০৯ এর ২(ছ) অনুযায়ী ‘তথ্য অধিকার’ অর্থ কোন সরকারি বা বেসরকারি সংস্থার কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে তথ্য প্রাপ্তির অধিকার। অর্থাৎ তথ্য অধিকার আইনের মাধ্যমে জনগণ সরকার,  সরকারি ও বিদেশী সাহায্যপুষ্ট বেসরকারি সংস্থা বা এনজিওর কাছ থেকে তাদের কাজ ও লেনদেন সংক্রান্ত অথবা জনগুরুত্বপূর্ণ যেকোন তথ্য চাইতে পারবে। যা আগে তারা জনগণকে দিতে বাধ্য ছিল না এবং কখনো কখনো জনগণকে জানতে দিতেও চাইত না। এই আইনের মাধ্যমে এখন সরকার ও বেসরকারি সংস্থা এই তথ্য দিতে বাধ্য।

তথ্য অধিকারের আইনের আওতায় ‘তথ্য’ কী

তথ্য অধিকার আইনের ২(চ) ধারায় তথ্য অর্থ কোনো সরকারি এবং সরকারি ও বিদেশী সাহায্যপুষ্ট বেসরকারি সংস্থার গঠন, কাঠামো ও দাপ্তরিক কর্মকান্ড সংক্রান্ত যে কোন স্মারক, বই, নকশা, মানচিত্র, চুক্তি, তথ্য-উপাত্ত, লগ বহি, আদেশ, বিজ্ঞপ্তি, দলিল, নমুনা, পত্র, প্রতিবেদন, হিসাব বিবরণী, প্রকল্প প্রস্তাব, আলোকচিত্র, অডিও, ভিডিও, অংকিতচিত্র, ফিল্ম, ইলেকট্রনিক প্রক্রিয়ায় প্রস্তুতকৃত যে কোন ইনস্ট্রুমেন্ট (যেমন, সফটওয়্যার, কার্টুনছবি) যান্ত্রিকভাবে পাঠযোগ্য দলিলাদি (মাইক্রোফিল্ম) এবং ভৌতিক গঠন ও বৈশিষ্ট্য নির্বিশেষে অন্য যে কোন তথ্যবহ বস্তু বা তার প্রতিলিপি সবই বোঝায়।

  • তবে মনে রাখতে হবে যে, দাপ্তরিক নোট সিট বা নোট সিটের প্রতিলিপি তথ্য হিসেবে অন্তর্ভূক্ত হবে না।
  • এই আইনের মাধ্যমে ‘তথ্য’ সরকারের কাজের সাথে সম্পর্কিত অপ্রকাশিত সব তথ্য। সাধারণ ‘তথ্য’ বলতে আমরা যা বুঝি তার সাথে এর পার্থক্য রয়েছে। যেমন, একটি উপজেলার কৃষি অফিসে কতজন কর্মকর্তা কর্মরত, কতজন থাকার কথা, তাদের দায়িত্ব কি কি, কোন দিন কোন ইউনিয়নে পরিদর্শন করার কথা ইত্যাদি ‘তথ্য’। এই তথ্যগুলি আইন অনুযায়ী জনগণের জানার অধিকার রয়েছে। আর আগামী মাসে উপজেলায় একটি ফুটবল টুর্ণামেন্ট অনুষ্ঠিত হবে। এটি একটি ‘সাধারণ তথ্য’।

তথ্য অধিকারের সাথে সংশ্লিষ্ট পক্ষসমূহ

কোন নাগরিক ব্যক্তিগতভাবে তার দৈনন্দিন কার্যক্রমে বিভিন্ন প্রয়োজনে বিভিন্ন ধরণের তথ্যের সন্ধান করে। তাই নাগরিক হচ্ছে তথ্য অধিকারের কেন্দ্রবিন্দূ। নাগরিক, যিনি তথ্য অনুসন্ধান করছেন, তিনি হচ্ছেন প্রথম পক্ষ। নাগরিক তথ্য অনুসন্ধানে সরাসরি তথ্য প্রদানকারী প্রতিষ্ঠানে যেতে পারে অথবা সশরীরে উপস্থিত না হয়েও তথ্য প্রদানকারী প্রতিষ্ঠানকে সুনির্দিষ্ট তথ্য প্রদানে অনুরোধ জানাতে পারে। তথ্য প্রদানকারী এই প্রতিষ্ঠানকে তথ্য অধিকার আইনে ‘কর্তৃপক্ষ’ হিসেবে অভিহিতি করা হয়েছে। তথ্য প্রদানকারী প্রতিষ্ঠান বা কর্তৃপক্ষ হচ্ছে দ্বিতীয় পক্ষ। অনেক সময় কর্তৃপক্ষ চাহিদাকৃত তথ্য সরবরাহ করতে অন্য কোন প্রতিষ্ঠান বা একই প্রতিষ্ঠানের শাখার বা বিভাগের শরণাপন্ন হন। তথ্য সরবরাহের সঙ্গে জড়িত অন্য এই প্রতিষ্ঠান বা বিভাগকে তৃতীয় পক্ষ বলা হয়। স্বাভাবিক পরিস্থিতিতে মূলত: এই তিন পক্ষ তথ্য অধিকারের সঙ্গে জড়িত।

তথ্য প্রদানকারী কর্তৃপক্ষ

তথ্য অধিকার আইন ২০০৯ ‘র ২ (খ)  অনুযায়ী যেসকল সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠান বা সংস্থা তথ্য প্রদানে বাধ্য, সেসব সংস্থা বা প্রতিষ্ঠানকে তথ্য প্রদানকারী কর্তৃপক্ষ বলে। প্রতিটি কর্তৃপক্ষের অন্যতম প্রধান কাজ হচ্ছে সহজে, কমমূল্যে কিংবা বিনা মূল্যে গ্রহীতাকে তথ্য দেয়া।

তথ্য অধিকার আইন অনুযায়ী ৭ ধরনের প্রতিষ্ঠানকে তথ্য প্রদানকারী ‘কর্তৃপক্ষ’ হিসেবে অভিহিত করা হয়। এসব কর্তৃপক্ষ বাংলাদেশের যেকোন নাগরিককে তথ্য দিতে বাধ্য।

নিন্মোক্ত ছকে কর্তৃপক্ষের সংজ্ঞা এবং এর উদাহরণ দেয়া হলো-

ক্রমকর্তৃপক্ষে’র সংজ্ঞাউদাহরণ
(অ) গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের সংবিধান অনুযায়ী সৃষ্ট কোন সংস্থাজাতীয় সংসদ, নির্বাহী বিভাগ, বিচার বিভাগ, নির্বাচন  কমিশিন, মহা হিসাব-নিরীক্ষক ও নিয়ন্ত্রকের দপ্তর সরকারী কর্ম কমিশিন, আটনি জেনারেল ইত্যাদি
(আ) গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের সংবিধানের ৫৫(৬) অনুচ্ছেদের অধীন প্রণীত কার্যবিধিমালার অধীন গঠিত সরকারের কোন মন্ত্রণালয়, বিভাগ বা কার্যালয়রাষ্ট্রপতির দপ্তর, প্রধানমন্ত্রীর দপ্তর, সকাররের সকল মন্ত্রণালয়, বিভাগ বা কার্যালয়ের অধীনস্থ সকল অধিদপ্তর/দপ্তরসমুহের  উপজেলা পর্যায় পর্যন্ত সকল অফিস।
(ই)কোন আইন দ্বারা বা উহার অধীন গঠিত কোন সংবিধিব্ধ সংস্থা বা প্রতিষ্ঠানমন্ত্রণালয়, বিভাগ বা কার্যালয়ের অধীন্থ সকল কর্পোরেশন, সকল স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠান যেমন, ইউনিয়ন পরিষদ, পৌরসভা, উপজেলা পরিষদ, জেলা পরিষদ, পৌরেসভা, সিটি কর্পোরেশন, দুর্নীতি দমন কমিশন, মানবাধিকার কমিশন, তথ্য কমিশন ইত্যাদি
(ঈ) সরকারি অর্থায়নে পরিচালিত বা সরকারি তহবিল হইতে সাহায্যপুষ্ট কোন বেসরকারি সংস্থা বা প্রতিষ্ঠানএমপিওভুক্ত সকল স্কুল ও কলেজ, পল্লী কর্ম সহায়ক ফাউন্ডেশন, প্রতিবন্ধী ফােউণ্ডেশন ইত্যাদি
(উ)বিদেশী সাহায্যপুষ্ট কোন বেসরকারি সংস্থা বা প্রতিষ্ঠানব্রাক, মানুষের জন্য ফাউণ্ডেশন, টিএইচপি, টিআইবি, গ্রামীন ব্যাংক ইত্যাদি
(ঊ)সরকারের পক্ষে অথবা সরকার বা সরকারি কোন সংস্থা বা প্রতিষ্ঠানের সহিত সম্পাদিত চুক্তি মোতাবেক সরকরী কার্যক্রম পরিচালনার দায়িত্ব প্রাপ্ত কোন বেসরকারি সংস্থা বা প্রতিষ্ঠানসরকারি কার্যক্রম পরিচালনার জন্য চুক্তিবদ্ধ সকল ঠিকাদারী  বা ইজারা গ্রহণকারী প্রতিষ্ঠান, ইত্যাদি
(ঋ)সরকার কর্তৃক, সময় সময়, সরকারী গেজেট প্রজ্ঞাপন দ্বারা নির্ধারিত অন্য কোন সংস্থা বা প্রতিষ্ঠানসরকারি গেজেটে প্রজ্ঞাপন দ্বারা অদ্যাবধি অন্য কোন সংস্থা বা প্রতিষ্ঠান নির্ধারণ করা হয়নি।

তথ্য প্রদানকারী ইউনিট

আইন অনুযায়ী প্রতিটি তথ্য প্রদানকারী প্রতিষ্ঠান বা কর্তৃপক্ষ এক একটি তথ্যপ্রদান ইউনিট। তবে অনেক তথ্য প্রদানকারী প্রতিষ্ঠান বা কর্তৃপক্ষের অধীনস্থ একাধিক কার্যালয় থাকতে পারে। সেক্ষেত্রে এই কর্তৃপক্ষের প্রতিটি কার্যালয়ে একটি তথ্য প্রদানকারী ইউনিট থাকে।

তথ্য প্রদানকারী কর্মকর্তা

তথ্য অধিকার আইনের আওতায় তথ্যের জন্য আবেদন গ্রহণ ও তথ্য প্রদান করার জন্য সকল তথ্য প্রদানকারী কর্তৃপক্ষের তথ্য প্রদানকারী ইউনিটে একজন দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা থাকা বাধ্যতামূলক।

এই কর্মকর্তা সংশ্লিষ্ট কার্যালয়ে তথ্য প্রদানে নিয়োজিত হন। তিনি তথ্য প্রদানকারী কর্মকর্তা হিসেবে অভিহিত। তথ্য  প্রদানে  দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা সার্বক্ষণিক হতে পারেন, খন্ডকালীন হতে পারেন, অথবা প্রতিষ্ঠানের ভেতরে কাউকে প্রাথমিক পর্যায়ে অতিরিক্তি দায়িত্ব হিসেবে দেয়া যেতে পারে। 

এই আইনের বিধান অনুযায়ী প্রত্যেক কর্তৃপক্ষ তথ্য সরবরাহের নিমিত্ত প্রতিটি তথ্য প্রদান ইউনিটের জন্য একজন করে দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা নিয়োগ করবে। প্রত্যেক কর্তৃপক্ষ নিয়োগকৃত প্রত্যেক দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তার নাম, পদবী, ঠিকানা এবং, প্রযোজ্য ক্ষেত্রে, ফ্যাক্স নম্বর ও ই-মেইল ঠিকানা নিয়োগ প্রদানের ১৫ (পনের) দিনের মধ্যে তথ্য কমিশনকে লিখিতভাবে অবহিত করবে।

এই আইনের অধীন দায়িত্ব পালনের প্রয়োজনে কোন দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা অন্য যে কোন কর্মকর্তার সহায়তা চাইতে পারবেন এবং কোন কর্মকর্তার নিকট হতে সহায়তা চাওয়া হলে তিনি উক্ত দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তাকে প্রয়োজনীয় সহায়তা প্রদান করতে বাধ্য থাকবেন। আইনের অধীন দায়-দায়িত্ব নির্ধারণের ক্ষেত্রে উক্ত অন্য কর্মকর্তাও দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা বলে গণ্য হবেন (ধারা-১০)।

  • প্রত্যেক কর্তৃপক্ষ এর প্রতিটি তথ্য প্রদান ইউনিটের জন্য কেন্দ্র, বিভাগ, জেলা ও সর্বনিম্ন উপজেলা পর্যায়ে একজন করে দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা নিয়োগ করবে।
  • আপনার প্রয়োজনীয় তথ্য পাওয়ার জন্য সংশ্লিষ্ট দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তার পরিচিতি আপনি তথ্য কমিশনের ওয়েবসাইট থেকে‘‘দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তার তালিকা’’ থেকে পেতে পারেন। উল্লেখ্য, এই তালিকা ক্রমঅগ্রসরমান।
  • দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা আবেদনপত্র প্রাপ্তির পরবর্তী নির্ধারিত দিনের মধ্যে আবেদনকারীকে অনুরোধকৃত তথ্য সরবরাহের জন্য সংশ্লিষ্ট দিন তারিখ উল্লেখ করতে হবে, সেই ক্ষেত্রে
  • দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তাকে ২০ (বিশ) দিনের মধ্যে তথ্য প্রদান করতে হবে
  • তথ্য প্রদানের সাথে একাধিক তথ্য প্রদান ইউনিট জড়িত থাকলে ৩০ (ত্রিশ) দিনের মধ্যে তথ্য প্রদান করতে হবে
  • চাহিত তথ্য কোন ব্যক্তির জীবন-মৃত্যু, গ্রেফতার এবং কারাগার হতে মুক্তি সম্পর্কিত হলে ২৪ (চবিবশ) ঘন্টার মধ্যে তথ্য সরবরাহ করতে হবে
  • দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা তদ্বিবেচনায় আবেদনপত্রটি গ্রহণযোগ্য না হলে আবেদনটি বাতিল করে দিতে পারে, সেক্ষেত্রে কারন দর্শানো নটিশ দিতে হবে
  • দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা আবেদনপত্র প্রাপ্তির পরবর্তী নির্ধারিত দিনের মধ্যে আবেদনকারীকে  অনুরোধকৃত তথ্য সরবরাহের জন্য সংশ্লিষ্ট দিন তারিখ উল্লেখ করতে হবে, সেই ক্ষেত্রে দেরী হলে অবশ্যই আবেদনকারীকে অবহিত করতে হবে।

একনজরে তথ্য পাওয়ার প্রক্রিয়া

১ম ধাপতথ্যের জন্য মৌখিকভাবে আবেদন করাযে উপায়ে বিরোধসৃষ্টির সম্ভাবনা রয়েছে তা যতদূর সম্ভব পরিহার করতে হবে
যদি তথ্য পাওয়া না যায় কিংবা প্রাপ্ত তথ্য নিয়ে সন্তুষ্ট না হলে
২য় ধাপতথ্য পেতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের  তথ্য প্রদান ইউনিটে নিয়োজিত তথ্য প্রদানকারী কর্মকর্তা বরাবর লিখিত আবেদন করা২৪ ঘন্টা প্রযোয্য হবে যখন আবেদিত তথ্য কারো জীবন ও মৃত্যু, গ্রেফতার ও কারাগার থেকে মুক্তির বিষয় জড়িত থাকে।
২০ কার্যদিবস প্রযোজ্য হবে যখন আবেদিত তথ্য প্রদানের জন্য একটিমাত্র দপ্তর বা কর্তৃপক্ষ জড়িত থাকে।
৩০ কার্যদিবস প্রযোজ্য হবে যখন আবেদিত তথ্য প্রদানের জন্য একের অধিক দপ্তর বা কর্তৃপক্ষ জড়িত থাকে।
যদি সর্বোচ্চ ২৪ ঘন্টা /২০ কার্যদিবস / ৩০ কার্যদিবসের মধ্যে সাড়া না পান কিংবা আবেদন প্রত্যাখাত হয় বা  তথ্য পেলেও তাতে যদি আপনি সন্তুষ্ট না হন তবে
৩য় ধাপপরবর্তী ৩০দিনে মধ্যে আপীল কর্তৃপক্ষ বরাবর আপীল করতে হবেআপীল কর্তৃপক্ষ – তথ্য প্রধান ইউনিটের অব্যবহিত কার্যালয়ের প্রশাসনিক প্রধান
যদি আপিল আবেদন করার পর সর্বোচ্চ ১৫ দিনের মধ্যে কোন শুনানী অন্তে আপীল নিষ্পত্তি না করেন বা আপনার আবেদন প্রত্যাখাত হয় বা প্রাপ্ত তথ্যে যদি সন্তুষ্ট না হন তবে
৪র্থ ধাপ৩০ দিনের মধ্যে তথ্য কমিশনে অভিযোগ দায়ের করতে পারবেন।সাধারনত ৪৫ বা  সর্বোচ্চ ৭৫ দিনের মধ্যে তথ কমিশন অভিযোগ নিষ্পত্তি করে।

তথ্য অধিকার আইনের প্রধান্য

বাংলাদেশে প্রচলিত আইনগুলির মধ্যে কতিপয় আইন যেমন ১৯২৩ সানের অফিসিয়ার সেক্রেসি এ্যাক্ট’ ৫(১) উপধারা, ১৯৭৯ সনের The Government Servants (Conduct) Rules এর বিধি ১৯, ১৮৭২ সনের সাক্ষ্য আইনের ১২৩, ১২৪ ও ১২৫ ধারাসমূহ , ১৯৯৬ সালের Rules of Business এর রুল ২৮ (১), ১৮৯৮ সনের ফৌজদারি কার্যবিধির ৯৯ ধারাসহ অন্যান্য কতিপয় আইনের কিছু কিছু ধারা তথ্য অধিকার আইনের সাথে কিছুটা সাংঘর্ষিক হলেও তথ্য প্রকাশের ক্ষেত্রে তথ্য অধিকার আইন, ২০০৯ এর ৩ ধারার মাধ্যমে সকল ধরনের বাধা অপসারিত হয়েছে।

তথ্য অধিকার আইনের আশ্রয় নিয়ে কোন ব্যক্তি তথ্য চেয়ে আবেদন করলে ধারা-৩ অনুযায়ী উপরোল্লিখত সকল বা অনুরূপ নিষেধাজ্ঞা কার্যকর হবে না  এবং এ সকল নিষেধাজ্ঞাকে অগ্রাহ্য করে তথ্য অধিকার আইনের ৪ ধারায় নাগরিকগণের তথ্য প্রাপ্তির অধিকার নিশ্চিত করার জন্য আইনের ৭ ধারার বিধানাবলী সাপেক্ষে চাহিত তথ্য সরবরাহ করা কর্তৃপক্ষের জন্য বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। নাগরিকগন তথ্য চাওয়া ও পাওয়ার ক্ষেত্রে এভাবেই তথ্য অধিকার আইনের শক্তি দ্বারা ক্ষমতায়িত হবেন। তাই বলা যায়, তথ্য অধিকার আইন রাষ্ট্রের কাছ থেকে জনগণের কাছে নিয়ন্ত্রণের চাবি পৌঁছে দিয়েছে এবং তথ্য অধিকার আইন নাগরিকগণের অন্যান্য আইনে প্রদত্ত অধিকার আদায়ের হাতিয়ার হিসেবে পরিণত হয়েছে।

আলোচ্য বিষয় ২.৪: তথ্য প্রাপ্তির আবেদন প্রক্রিয়া

তথ্য অধিকার আইন অনুসারে তথ্য পাওয়ার জন্য একজন আবেদনকারীকে যেসব ধাপ পাড়ি দিতে হয়-

ধাপ ১:

তথ্য আদায় কোন বিচ্ছিন্ন একটি কাজ নয়। মূলত: কোন সমস্যা নিরসনের ক্ষেত্রে বা অধিকার প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে এমন কিছু তথ্যের প্রয়োজন হয়, যা সাক্ষ্য বা প্রমাণ হিসেবে কাজ করে ও মূল সমস্যা সমাধান বা অধিকার আদায়ে সহায়ক হয়। সাক্ষ্য বা প্রমাণ হিসেবে ব্যবহারের জন্য প্রয়োজনীয় তথ্য সমস্যার সঙ্গে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে জড়িত প্রতিষ্ঠানের কাছে থাকতে পারে অথবা অন্য কোন প্রতিষ্ঠানের কাছে থাকতে পারে। তাই প্রথমে কোন তথ্য প্রয়োজন তা সুনির্দিষ্টভাবে চিহ্নিত করুন। 

চাহিদাকৃত তথ্যটি আইনের কর্তৃপক্ষ দিতে বাধ্য নয় এমন তালিকায় অর্থাৎ আইনের ৭ ধারায় আছে কীনা দেখে নিন। না তাকলে নিশ্চিন্ত মনে অগ্রসর হন। আইনের ৭ ধারায় পড়ে  কীনা তা অনেক সময় বোঝা মুশকিল। সেক্ষেত্রে তথ্য কমিশন বা সংশ্লিষ্ট বেসরকারী প্রতিষ্ঠান বা অভিজ্ঞদের কাছে গিয়ে পরামর্শ করুন। এছাড়া, চাহিদাকৃত তথ্য দুর্নীতি বা মানবাধিকার সংক্রান্ত কীনা নিশ্চিত হয়ে নিন।

ধাপ ২:

কোন প্রতিষ্ঠনের কাছে ওই তথ্য পবেন তা চিহ্নিত করুন। এজন্য তথ্য কমিশনে যোগাযোগ করতে পারেন অথবা সংশ্লিষ্ট স্থানীয় বেসরকারী প্রতিষ্ঠানে যোগাযোগ করুন অথবা অভিজ্ঞ কোন ব্যক্তির সাথে পরামর্শ করুন। যে প্রতিষ্ঠানের কাছে তথ্য চাইবেন, আইনের আওতায় সেটি অব্যাহতি প্রাপ্ত কীনা দেখে নিন। চাহিদাকৃত তথ্য দুর্নীতি বা মানবাধিকার সংক্রান্ত হলে অব্যাহতি প্রাপ্ত প্রতিষ্ঠান হলেও প্রতিষ্ঠানটি তথ্য দিতে বাধ্য থাকবে।

ধাপ ৩:

কী মাধ্যমে আবেদন করবেন নির্ধারণ করুন। সরাসরি নিজে গিয়ে বা কোন প্রতিনিধির মাধ্যমে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তার কাছে  সুনির্দিষ্ট তথ্য চাওয়া যেতে পারে। অথবা ফ্যাক্স করে অথবা ইমেইল করে তথ্যের জন্য আবেদন করতে পারেন। ইলেকট্রনিক মাধ্যমে আবেদন গ্রহণের ক্ষেত্রে কর্তৃপক্ষের বরাবর আবেদন প্রেরণের তারিখই আবেদন গ্রহণের তারিখ বলে বিবেচিত হবে।

ধাপ ৪:

সুনির্দিষ্ট তথ্যের জন্য লিখিত ভাবে অথবা ডিজিটাল মাধ্যমে তথ্য প্রদানকারী ইউনিটের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তার কাছে তথ্য চাইবেন। তথ্য প্রাপ্তির জন্য নির্ধারিত ’’ক’’ আবেদন ফরমে  লিখিতভাবে আবেদন করতে হবে। তবে অনেক ক্ষেত্রে সুনির্দিষ্ট ফরম নাও থাকতে পারে। সেক্ষেত্রে নিজের তৈরী একই ধরণের ফরমেট ব্যবহার করে সাদা কাগজে আবেদন করতে পারেন তবে নিম্নলিখিত বিষয়সমূহের উল্লেখ নিশ্চিত করুন: 

১) দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তার নাম, পদবী ও দাপ্তরিক ঠিকানা;

২) অনুরোধকারীর নাম, ঠিকানা, প্রযোজ্য ক্ষেত্রে, ফ্যাক্স নম্বর এবং ই-মেইল ঠিকানা;

৩) যে তথ্যের জন্য অনুরোধ করা হয়েছে তার নির্ভুল এবং স্পষ্ট বর্ণনা;

৪) অনুরোধকৃত তথ্যের অবস্থান নির্ণয়ের সুবিধার্থে অন্যান্য প্রয়োজনীয় প্রাসঙ্গিক তথ্যাবলী; এবং

৫) কোন পদ্ধতিতে তথ্য পেতে আগ্রহী তার বর্ণনা, যেমন পরিদর্শন করা, অনুলিপি নেওয়া, নোট নেওয়া বা অন্য কোন অনুমোদিত পদ্ধতি (যেমন, ছবি তোলা)।

ধাপ ৫:

তথ্য প্রাপ্তির ক্ষেত্রে অনুরোধকারীকে সংশ্লিষ্ট দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা কর্তৃক উক্ত তথ্যের জন্য নির্ধারিত সময় (অনধিক ৫ কর্মদিবস) নির্ধারিত যুক্তিসংগত মূল্য পরিশোধ করুন। তথ্যের মূল্য নিয়ে আপত্তি থাকলে আপীল করা যায়। আপীলের সিদ্ধান্ত গ্রহণযোগ্য মনে না হলে তথ্য কমিশেনে অভিযোগ দায়ের করা যায়। সর্বোপরি উচ্চ আদালতে রীট আবেদন করা যায়।

ধাপ ৬:

তথ্য চেয়ে আবেদন করলে প্রয়োজনীয় ক্ষেত্রে তথ্যমূল্য পরিশোধের নিদিষ্ট কোডে (১-৩৩০১-০০০১-১৮০৭) টাকা জমা দেওয়ার পর প্রাপ্তি রশিদ (তারিখ উল্লেখ সহ) চেয়ে নিন এবং আবেদন পত্রের সাথে সংযুক্ত করুন । দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তার কাছ থেকে আবেদন প্রত্রের প্রাপ্তি স্বীকার পত্র চেয়ে নিতে হবে-সই, নাম, পদবী, সীল ও তারিখসহ।

ধাপ ৭:

নির্ধারিত তারিখে চাহিদাকৃত তথ্য সশরীরে তথ্য প্রদানকারী অফিসে গিয়ে, বা কোন প্রতিনিধির মাধ্যমে বা ইলেকট্রনিক মাধ্যমে তথ্য বুঝে নিন। চাহিদামত তথ্য পেলেন কীনা দেখে নিন। না পেলে তথ্য প্রদানকারী কর্মকর্তাকে তাৎক্ষণিকভাবে জানান। সুরাহা না হলে আপনি উর্ধতন কর্তৃপক্ষের কাছে আপীল করতে পারেন। আপীলের সিদ্ধান্ত গ্রহণযোগ্য মনে না হলে তথ্য কমিশেনে অভিযোগ দায়ের করা যায়। সর্বোপরি উচ্চ আদালতে রীট আবেদন করা যায়।

তথ্য পাওয়ার খরচ এবং সময়

তথ্য পাওয়ার খরচ:

এই আইনের অধীনে তথ্য প্রাপ্তির ক্ষেত্রে অনুরোধকারীকে সংশ্লিষ্ট দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তাকর্তৃক উক্ত তথ্যের জন্য নির্ধারিত যুক্তিসংগত মূল্য পরিশোধ করিতে হইবে। সরকার, তথ্য কমিশনের সহিত পরার্মশক্রমে এবং সরকারী গেজেটে প্রজ্ঞাপন দ্বারা, তথ্য প্রাপ্তির অনুরোধ ফিস এবং, প্রয়োজনে, তথ্যের মূল্য নির্ধারণ করিয়া দিতে পারিবে এবং, ক্ষেত্রমত, কোন ব্যক্তি বা ব্যক্তি-শ্রেণীকে কিংবা যে কোন শ্রেণীর তথ্যকে উক্ত মূল্য প্রদান হইতে অব্যাহতি প্রদান করিতে পারিবে। প্রত্যেক কতৃর্পক্ষ, তথ্য কমিশনের নির্দেশনা অনুসরণে, বিনামূল্যে যে সকল তথ্য সরবরাহ করা হইবে উহার একটি তালিকা প্রস্তুত করিয়া প্রকাশ ও প্রচার করিবে। তথ্যমূল্য জমাদানের নিদিষ্ট কোড হল: ১-৩৩০১-০০০১-১৮০৭

তথ্য পাওয়ার সময়:

তথ্য প্রদানের বেশীরভাগ ক্ষেত্রে আইনে সময় নির্ধারণ করে দেয়া আছে। আপনার চাওয়া তথ্যটি যদি কারো কাছ থেকে না নিতে হয় এবং সেই প্রতিষ্ঠনের কাছে তথ্য থাকে তাহলে ২০ কার্যদিবসের মধ্যে অথবা অন্য কোন তথ্য প্রদান ইউনিট থেকে সংগ্রহ করতে হলে ৩০ কার্যদিবসের মধ্যে আপনি তথ্য পাবেন। তবে জীবন-মৃত্যু, গ্রেফতার বা কারাগার থেকে মুক্তি সম্পর্কিত হয় তাহলে আপনাকে ২৪ ঘন্টার মধ্যে প্রাথমিক তথ্য দেবে সংশ্লিষ্ট ইউনিট।

সময়কখন প্রযোজ্যকার দায়িত্বউপকারভোগী
অনুরোধ প্রাপ্তির তারিখ হতে অনধিক ২০ কর্মদিবসের মধ্যে। ধারা ৯(১)অনুরোধকৃত তথ্যের সাথে যদি একাধিক তথ্য প্রদান কর্তৃপক্ষের সংশ্লিষ্টতা না থাকে (তৃতীয় পক্ষ)।দায়িত্ব প্রাপ্ত কর্মকর্তা (কর্তৃপক্ষ)নাগরিক
অনুরোধ প্রাপ্তির তারিখ হতে অনধিক ৩০ (ত্রিশ) কার্যদিবসের মধ্যে। ধারা ৯(২)অনুরোধকৃত তথ্যের সাথে যদি একাধিক তথ্য প্রদান কর্তৃপক্ষের সংশ্লিষ্টতা থাকে (তৃতীয় পক্ষ)।প্রথম কর্তৃপক্ষনাগরিক
আবেদন প্রাপ্তির ১০ (দশ) কার্যদিবসের মধ্যে। ধারা ৯(৩)কোন কারণে তথ্য প্রদানে অপারগ হলে অপারগতার কারণ আবেদনকারীকে জানানো।কর্তৃপক্ষনাগরিক
অনুরোধ প্রাপ্তির ২৪ ঘণ্টার মধ্যে। ধারা ৯(৪)অনুরোধকৃত তথ্য কোন ব্যক্তির জীবন মৃত্যু, গ্রেফতার এবং কারাগার হতে মুক্তি সম্পর্কিত (প্রাথমিক তথ্য)। দায়িত্ব প্রাপ্ত কর্মকর্তা (কর্তৃপক্ষ)নাগরিক
অনুরোধ প্রাপ্তির অনধিক ৫ (পাঁচ) কার্যদিবসের মধ্যে। ধারা ৯(৬)(যেসব তথ্য চাহিবামাত্র দিবার জন্য মজুদ থাকবে) তথ্যের যুক্তিসংগত মূল্য পরিশোধের জন্য।অনুরোধকারী (নাগরিক)দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (কর্তৃপক্ষ)
অনুরোধ প্রাপ্তির ৫ (পাঁচ) কার্যদিবসের মধ্যে। ধারা ৯(৮)অনুরোধকৃত তথ্য যদি তৃতীয় পক্ষের সাথে যুক্ত হয় তবে তৃতীয় পক্ষকে তার লিখিত বা মৌখিক মতামত চেয়ে নোটিশ প্রদান।কর্তৃপক্ষ (২য় পক্ষ)কর্তৃপক্ষ (২য় পক্ষ) এবং অনুরোধকারী (নাগরিক)
অনুরোধ প্রাপ্তির ৩০ (ত্রিশ) দিনের মধ্যে। ধারা ৩২(৩)রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা ও গোয়েন্দা কার্যে নিয়োজিত সংস্থা বা প্রতিষ্ঠানের কাছে তথ্য চাইলে এবং তথ্যটি দুর্নীতি বা মানবাধিকার লংঘনের ঘটনার সাথে জড়িত থাকলে তথ্য কমিশনের অনুমোদন গ্রহণ সাপেক্ষে প্রদান।রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা ও গোয়েন্দা কার্যে নিয়োজিত সংস্থা বা প্রতিষ্ঠান।অনুরোধকারী (নাগরিক)

 তথ্যের জন্য আবেদনের একটি নুমনা 

আলোচ্য বিষয় ২.৫: আপীল দায়ের ও নিষ্পত্তি

আপীল কি এবং কেন?

তথ্যপ্রাপ্তির প্রক্রিয়ায় নাগরিক বা প্রতিষ্ঠান বিভিন্ন কারণে সংক্ষুব্ধ হতে পারেন। কোন কারণে নাগরিক বা তথ্য চাহিদাকারী সংক্ষুব্ধ হলে তথ্য অধিকার নিয়ে একটা বিরোধের সূত্রপাত হবে। এই বিরোধ নিরসনের প্রথম উপায় হল হল আপীল কর্তৃপক্ষের শরনাপন্ন হওয়া। আপীল কর্তৃপক্ষের কাজে সন্তুষ্ট না হলে শেষ অস্ত্র হল তথ্য কমিশনে অভিযোগ করা। তথ্য কমিশনে অভিযোগ পেশ করার আগে তাই আপীল কর্তৃপক্ষের শরণাপন্ন হওয়া শ্রেয়।

আপীল কর্তৃপক্ষ কে

তথ্য অধিকার আইন অনুসারে আপীল কর্তৃপক্ষ হচ্ছে- যে তথ্য প্রদান ইউনিটে আবেদন করা হয়েছে সেই ইউনিটের ঊর্ধতন কার্যালয়ের প্রশাসনিক প্রধান। যেমন, কেউ যদি উপজেলা কৃষি অফিসে আবেদন করে থাকেন তাহলে তাকে আপীল করতে হবে জেলা কৃষি অফিসের প্রশাসনি প্রধান  উপ-পরিচালকের কাছে। একইভাবে ইউএনও অফিসের আপীল কর্তৃপক্ষ জেলা প্রশাসক।

যেসকল তথ্য প্রদান ইউনিটের কোন ঊর্ধতন কার্যালয় নাই, সেইসকল ইউনিটে আবেদনের ক্ষেত্রে আপীল কর্তৃপক্ষ হবেন ওই তথ্য প্রদান ইউনিটের প্রশাসনিক প্রধান। যেমন, মন্ত্রণালয়ে আবেদন করেছেন। সাধারণত মন্ত্রণালয়সমূহের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা হয়ে থাকেন কোনো উপসচিব বা যুগ্নসচিব পদমর্যাদার একজন কর্মকর্তা। মন্ত্রণালয়ের যেহেতু কোনো ঊর্ধতন কার্যালয় নেই, মন্ত্রণালয়ের আপীল কর্তৃপক্ষ হবেন সচিব। একইভাবে ইউনিয়ন পরিষদে আবেদন করলে, ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান হবেন ইউনিয়ন পরিষদের আপীল কর্তৃপক্ষ।

নামের একটি নির্দিষ্ট ফর্ম পূরণ করে আপীল আবেদন করতে হবে।

আপীল কতৃর্পক্ষের দায়িত্ব এবং কর্তব্য

  • আপীল কর্তৃপক্ষ আপীল আবেদন প্রাপ্তির পরবর্তী ১৫ (পনের) দিনের মধ্যে আপীল আবেদনকারীকে অনুরোধকৃত তথ্য সরবরাহের জন্য সংশ্লিষ্ট দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তাকে নির্দেশ প্রদান করবে।
  • আপীল কর্তৃপক্ষ আপীল আবেদনটি তদ্বিবেচনায় গ্রহণযোগ্য না হলে আপীল আবেদনটি খারিজ করে দিবে।
  • দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা উক্তরূপ নির্দেশ প্রাপ্তির তারিখ হতে নির্ধারিত সময়সীমার মধ্যে আপীল আবেদনকারীকে অনুরোধকৃত তথ্য সরবরাহ করবে (ধারা-২৪)।

 আপীল প্রক্রিয়া/কিভাবে আপীল করবেন?

আপীল নিষ্পত্তির ক্ষেত্রে নিম্ন-লিখিত ধাপগুলি অনুসরণ করুন:

ধাপ ১: 

কি কারণে আপীল করতে চান তা আগে নির্ধারণ করুন। ছয়টি ক্ষেত্রে তথ্য প্রাপ্তি নিয়ে বিরোধ সৃষ্টি হতে পারে। আপনার ক্ষেত্রে কোন কারণটি প্রযোজ্য তা নির্ধারণ করুন:

১. দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা আবেদন পত্র গ্রহণ না করলে

২. তথ্য পাওয়া না গেলে

৩. দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা নির্দিষ্ট সময়ে তথ্য প্রদানে ব্যর্থ হলে

৪. তথ্যের মূল্য নিয়ে বিরোধ হলে

৫. ভুল তথ্য প্রাপ্তি

৬.অসম্পূর্ণ অথবা বিভ্রামিত্মমূলক তথ্য প্রাপ্তি

ধাপ ২:•ধাপ-৬

আপনি কীভাবে আপীল করতে চান তা ঠিক করে নিন: ব্যক্তিগতভাবে বা আইনজীবীর মাধ্যমে।

ধাপ ৩:

তথ্য ইউনিটের কর্মকর্তা কর্তৃক প্রদত্ত কাগজ চেয়ে নিন। যেমন, কোন তারিখে তথ্য চেয়ে আবেদন করা হয়েছিল, তার প্রমাণ। অথবা, তথ্য চেয়ে প্রত্যাখ্যাত হলে, প্রত্যাখ্যানপত্র, অথবা, তথ্য প্রদানে অপারগতা প্রকাশ করা হলে অপারগতাপত্র।  এসব তথ্য আপীল আবেদনের সাথে সংযুক্ত করতে হবে।  সংশ্লিষ্ট কাগজে উল্লেখিত তারিখটি খেয়াল করে দেখুন, আপীলকারী ৩০ দিনের মধ্যে আবেদনটি করতে পারছেন কিনা। কোন যুক্তিসংগত কারণে নির্দিষ্ট সময়সীমার মধ্যে যদি আপীলকারী আপীল দায়ের করতে না পারেন তাহলে নির্দিষ্ট ৩০ দিনের সময়সীমা অতিবাহিত হওয়ার পরও আপীল আবেদন করতে পারবেন। যদি আপীলকারী ৩০ দিনের মধ্যে আপীল না করতে পারেন, তাহলে তার যুক্তিসংগত কারণ উল্লেখ করুন। যেমন, হাসপাতালে শয্যাশায়ী ছিলেন, অথবা জরুরি কাজে দেশের বাইরে ছিলেন, ইত্যাদি। এরকম ক্ষেত্রে আপীল আবেদন নির্ধারিত সময়ের পরও গ্রহণ করা হয়। লিখিত ভাবে ‘গ’ আপীল ফরম নামের একটি নির্দিষ্ট ফর্ম পূরণ করে আপীল আবেদন করুন এবং প্রাপ্তি স্বীকার রশিদ সংগ্রহ করুন।

ধাপ ৪:

আপীল আবেদন পাওয়ার পর আপীল কর্তৃপক্ষ আপীল আবেদনকারীকে অনুরোধকৃত তথ্য সরবরাহের জন্য সংশিস্নষ্ট দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তাকে নির্দেশ প্রদান করবেন; অথবা তদ্বিবেচনায় গ্রহণযোগ্য না হইলে আপীল আবেদনটি খারিজ করে দিবেন। প্রয়োজন বোধ করলে শুনানীর আয়োজন করতে পারেন। শুনানীতে অভিযোগকারী, সংশ্লিষ্ট তথ্য কর্মকর্তা ও ক্ষেত্রমত তৃতীয়পক্ষকে ডাকুন। শুনানীর ৭ দিন আগে সংশ্লিষ্ট পক্ষসমূহকে জানাতে হবে।

শুনানী শেষে রায়ের তারিখ লিখিত ভাবে জানান। খেয়াল রাখবেন, আপীল আবেদনের ১৫ দিনের মধ্যে আপীলের ফলাফল লিখিতভাবে জানাতে হবে। ১৫ দিনের মধ্যে আপীলের ফলাফল না জানালে অথবা আপীলের ফলাফলে সন্তুষ্ট না হলে আপীল আবেদনকারী তথ্য কমিশনে অভিযোগ করতে পারেন।

ধাপ ৫:

আপীল আবেদনের ১৫ দিনের মধ্যে আপীলের ফলাফলের জন্য অপেক্ষা করুন। ফলাফলের লিখিত কপি সংগ্রহ করুন।

ধাপ ৬:

১৫ দিনের মধ্যে আপীলের ফলাফল না পেলে অথবা আপীলের ফলাফলে সন্তুষ্ট না হলে তথ্য কমিশনে অভিযোগ করার জন্য এগিয়ে যান।

নমুনা আপীল আবেদন

আলোচ্য বিষয় ২.৬: অভিযোগ দায়ের ও নিষ্পত্তি

অভিযোগ কখন এবং কোথায় করবেন

আমরা জানি আপীল কর্তৃপক্ষ ১৫ দিনের মধ্যে আপীল নিষ্পত্তি করবেন। এখন ১৫ দিনের মধ্যে যদি আপীল নিষ্পত্তি না হয় অথবা আপীল কর্তৃপক্ষ সিদ্ধান্ত দিলেন কিন্তু সেই সিদ্ধান্তে আবেদনকারী সন্তুষ্ট হলেন না, তাহলে তিনি ব্যক্তিগতভাবে বা আইনজীবীর মাধ্যমে তথ্য কমিশনে অভিযোগ দায়ের করতে পারবেন।

আবার কোন কর্তৃপক্ষ তথ্য প্রদানকারী দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা নিয়োগ না দিলে কিংবা তথ্যের জন্য অনুরোধ পত্র গ্রহণ না করলে আপীল দায়ের না করেই আবেদনকারী সরাসরি তথ্য কমিশনে অভিযোগ দায়ের করতে পারবেন। 

অভিযোগ প্রক্রিয়া ও করনীয় বিষয়সমূহ

ধাপ ১:

আবেদনকারী  তথ্য ইউনিটের কোন সিদ্ধান্তে সংক্ষুব্ধ হলে অথবা তথ্য ইউনিটের সাথে সংশ্লিষ্ট আপীল কর্তৃপক্ষের সিদ্ধান্তে সংক্ষুব্ধ হলে তথ্য কমিশনে ব্যক্তিগতভাবে বা আইনজীবীর মাধ্যমে অভিযোগ উত্থাপন করতে পারবেন । কীভাবে, অর্থাৎ ব্যক্তিগতভাবে বা আইনজীবীর মাধ্যমে অভিযোগ করবেন, তা ঠিক করুন।

ধাপ ২: 

কী কারণে অভিযোগ করবেন, তা ঠিক করুন। নিন্মলিখিত যেকোন একটি কারণে অভিাযোগ করা যাবে:

  • কোন কর্তৃপক্ষ কর্তৃক দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা নিয়োগ না করলে কিংবা তথ্যের জন্য অনুরোধপত্র গ্রহণ না করলে;
  • কোন তথ্য চেয়ে প্রত্যাখ্যাত হলে;
  • তথ্যের জন্য অনুরোধ করে নির্ধারিত সময়সীমার মধ্যে কর্তৃপক্ষের নিকট হতে কোন জবাব বা তথ্য না পেলে;
  • কোন তথ্যের এমন অংকের মূল্য দাবী করা হলো, বা প্রদানে বাধ্য করা হলে, যা তার বিবেচনায় যৌক্তিক নয়;
  • অনুরোধের প্রেক্ষিতে অসম্পূর্ণ তথ্য প্রদান করা হলে বা যে তথ্য প্রদান করা হয়েছে তা ভ্রান্ত ও বিভ্রান্তিকর বলে মনে হলে;
  • তথ্য অধিকার আইন ২০০৯-এর অধীন তথ্যের জন্য অনুরোধ জ্ঞাপন বা তথ্য প্রাপ্তি সম্পর্কিত অন্য যে কোন বিষয়ে।
  • আপীলের সিদ্ধান্তে সংক্ষুব্ধ হলে ।
  • আপীল আবেদনের পরবর্তী আইনানুযায়ী নিদিষ্ট সময়সীমার মধ্যে তথ্য প্রাপ্তি বা, ক্ষেত্রমত, তথ্য প্রদান সংক্রান্ত সিদ্ধান্ত প্রাপ্ত না হলে।

ধাপ ৩:

আপীল নিষ্পত্তি সংক্রান্ত ১৫ দিনের সয়মসীমা পার হয়ে যাওয়ার বা ক্ষেত্রমতো, সিদ্ধান্ত পাওয়ার পরবর্তী ৩০ দিনের মধ্যে আবেদনকারীকে তথ্য কমিশনে অভিযোগ দায়ের করতে হয়ে। তবে তথ্য কমিশিন যদি মনে করে যে, যুক্তিসংগত কারণে আবেদনকারী ৩০ দিনের মধ্যে অভিযোগ দাখিল করতে পারেননি, তাহলে কমিশন নির্ধারিত সময়ের পরও অভিযোগ গ্রহণ করতে পারবেন।

নির্ধারিত ‘ক’ ফরম পূরণ করে এবং তার সাথে তথ্য আবেদনের এবং আপীল আবেদনের ফটোকপি, প্রাপ্তি স্বীকারপত্র, তথ্য মূল্য পরিশোধের রশিদ (যদি থাকে) এবং প্রামণের জন্য অন্যান্য প্রয়োজনীয় ডকুমেন্টস যেমন, সরবরাহকৃত তথ্য ইত্যাদি সহ অভিযোগ ফরমটি রেজিস্ট্রী ডাকযোগে তথ্য কমিশনের ঠিকানায় প্রেরণ করবেন। 

ধাপ ৪:

ফলাফলের জন্য অপেক্ষা করুন। এই সময়ে তথ্য কমিশন অভিযোগ পর্যালোচনা করবেন। প্রয়োজনে অনুসন্ধান করবেন। অভিযোগ প্রাপ্তির ৩০ (ত্রিশ) দিনের মধ্যে কার্যপত্র প্রস্তুত করবেন ও তথ্য কমিশনের সভায় উপস্থাপন করবেন। প্রয়োজনে শুনানীর আয়োজন করবেন। সেই শুনানীতে নির্দিষ্ট সময়ে আবেদনকারী উপস্থিত থাকবেন।

ধাপ ৫:

তথ্য কমিশন সাধারণভাবে ৪৫ দিনের মধ্যে অভিযোগ নিষ্পত্তি করবেন। তবে প্রয়োজন হলে বর্ধিত সময়ের মধ্যে অভিযোগ নিষ্পত্তি করবেন। তবে নিষ্পত্তির সময়সীমা, বর্ধিত সময়সহ, কোনক্রমেই সর্বসোট ৭৫ দিনের বেশি হবে না । তথ্য কমিশন যদি এই সিদ্ধান্তে উপনীত হন যে, কোন কর্তৃপক্ষ বা কোন দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা এই আইনের বিধানাবলী অনুসরনে করণীয় কোন কাজ করতো ব্যর্থ হয়েছেন বা করণীয় নয় এমন কাজ করেছেন, তাহলে তথ্য কমিশন এই আইনের অধীনে সংশ্লিষ্ট দায়িত্ব প্রাপ্ত কর্মকর্তার বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করতে পারেন।

দায়িত্ব প্রাপ্ত কর্মকর্তার বিরুদ্ধে শাস্তি

যেসব কারণে জরিমানা বা শাস্তি হতে পারে, সেগুলি হলো-

  • কোন দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা কোন যুক্তিগ্রাহ্য কারণ ছাড়াই তথ্য প্রাপ্তির কোন অনুরোধ বা আপীল গ্রহণ করিতে অস্বীকার করলে;
  • এই অধ্যাদেশ দ্বারা নির্ধারিত সময়সীমার মধ্যে অনুরোধকারীকে তথ্য প্রদান করতে কিংবা এই বিষয়ে সিদ্ধান্ত প্রদান করিতে ব্যর্থ হলে;
  • অসদুদ্দেশ্যে তথ্য প্রাপ্তির কোন অনুরোধ বা আপীল প্রত্যাখ্যান করলে;
  • যে তথ্য প্রাপ্তির অনুরোধ করা হয় তাহা প্রদান না করে ভুল, অসম্পূর্ণ, বিভ্রান্তিকর বা বিকৃত তথ্য প্রদান করলে;
  • কোন তথ্য প্রাপ্তির পথে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করলে;

আইন লঙ্ঘনে দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তার শস্তি বিষয়ে যেসব আদেশ বা সিদ্ধান্ত তথ্য কমিশন  দিতে পারেন তা হলো-

জরিমানা ও ক্ষতিপুরণ

আইন ভঙ্গের তারিখ থেকে তথ্য সরবরাহের তারিখ পর্যন্ত প্রতি দিনের জন্য ৫০ টাকা হারে জরিমানা আরোপ করতে পারবে, এবং এই জরিমানা কোনক্রমেই ৫০০০ (পাঁচ হাজার) টাকার অধিক হবে না। জরিমানা আরোপের আগে তথ্য কমিশন দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তাকে তাঁর বক্তব্য প্রকাশের সুযোগ দিবেন। কোন ক্ষতি বা অন্য কোন দুর্ভাগের জন্য ক্ষতিপূরনের আদেশ প্রদান করতে পারেন।

বিভাগীয় শাস্তি

তথ্য কমিশন যদি এই মর্মে সন্তুষ্ট হয় যে, নাগরিকের তথ্য প্রাপ্তিতে উল্লিখিত কার্যকলাপের মাধ্যমে কোন কর্মকর্তা বিঘ্ন সৃষ্টি করেছেন, তাহলে তথ্য কমিশন, প্রযোজ্য ক্ষেত্রে, অর্থ জরিমানা ছাড়াও সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তার এরকম কাজকে অসদাচরণ গণ্য করে তার বিরুদ্ধে বিভাগীয় শাস্তিমূলক কার্যক্রম গ্রহণ করার জন্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ বরাবরে সুপারিশ করতে পারবে এবং এই বিষয়ে গৃহীত সর্বশেষ ব্যবস্থা তথ্য কমিশনকে অবহিত করার জন্য উক্ত কর্তৃপক্ষকে অনুরোধ করতে পারবে।

জরিমানা পরিশোধ না হলে

পরিশোধযোগ্য কোন জরিমানা বা ক্ষতিপূরণ পরিশোধ না হলে তা সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তার কাছ Public demand Recovery Act ১৯১৩ (Act Ix of 1913) এর বিধান অনুযায়ী বকেয়া ভূমি রাজস্ব যে পদ্ধতিতে আদায় করা হয় সেই পদ্ধতিতে আদায়যোগ্য হবে।

অভিযোগ ও আপিলের মধ্যে পার্থক্য

আপীলঅভিযোগ
আবেদনকারী তার আবেদনের প্রেক্ষিতে তথ্য প্রদান ইউনিট থেকে সঠিক তথ্য পেয়ে সন্তুষ্ট না হলে, আবেদনকারী আপীল র্কতৃপক্ষের কাছে নির্দিষ্ট আইনানুগ নিয়ম ও সময়ের মধ্যে তাকে আপীল করতে হবে।আবেদনকারী তার আবেদনের প্রেক্ষিতে তথ্য প্রদান ইউনিট থেকে সঠিক তথ্য পেয়ে সন্তুষ্ট না হলে, এবং আবেদনকারী আপীল র্কতৃপক্ষের কাছে নির্দিষ্ট আইনানুগ নিয়ম ও সময়ের মধ্যে আপীল করে সঠিক তথ্য পেয়ে সন্তুষ্ট না হলে কিংবা তথ্য আদান প্রদানের যে কোন সময়ে আইন পরিপন্থী পরিস্থিতির পরিপেক্ষিতে তথ্য কমিশনের কাছে অভিযোগ করতে হবে।
যিনি আপীল আবেদন করবেন, তিনি আপীলকারী হিসেবে গণ্য হবেন।যিনি অভিযোগ আবেদন করিবেন, তিনি অভিযোগকারী হিসেবে গণ্য হবেন।
আপীলকারী নিজে বা তার প্রতিনিধি দিয়ে আপীল কর্তৃপক্ষের কাছে আপীল করতে  পারেন।অভিযোগকারী নিজে বা তার প্রতিনিধি দিয়ে তথ্য কমিশনে অভিযোগ  করতে পারেন।
আপীল কর্তৃপক্ষের সিদ্ধান্তের বিপরীতে তথ্য কমিশনে অভিযোগ দায়ের করা যাবে। তথ্য কমিশনের সিদ্ধান্তই চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত ।
আপীল কর্তৃপক্ষের মূল কাজ হলো প্রশাসনিকতথ্য কমিশনের মূল কাজ হলো বিচারিক

অভিযোগ দায়েরের নমুনা ফরম

আলোচ্য বিষয় ২.৭: অপ্রদানযোগ্য তথ্য এবং তথ্য প্রদান থেকে দায়মুক্ত প্রতিষ্ঠান

তথ্য অধিকার আইন ২০০৯’র আওতায় কোন তথ্যগুলি চাওয়া যাবে না 

তথ্য অধিকার আইনের ৭ ধারার ২০টি উপধারায় সংশ্লিষ্ট তথ্যাবলী প্রদান বাধ্যতামূলক নয় বলে ঘোষণা করা হয়েছে। যে সকল তথ্য প্রকাশ পেলে জনস্বার্থ বিঘ্নিত হতে পারে, অর্থাৎ জনস্বার্থ সুরক্ষার জন্য যেসব তথ্য গোপন রাখা আবশ্যক, সেগুলিই কেবল এই তালিকায় রয়েছে, যা আমাদের সংবিধানের ৩৯(২) উপ-অনুচ্ছেদ, রাষ্ট্রীয় আইন ও আন্তর্জাতিক দলিলাদির সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ।

এই আইন অনুযায়ী নিম্নোক্ত তথ্যসমূহ প্রদানে কর্তৃপক্ষ বাধ্য নয়-

  • দাপ্তরিক নোট সিট বা নোট সিটের প্রতিলিপি;
  • কোন তথ্য প্রকাশের ফলে বাংলাদেশের নিরাপত্তা, অখন্ডতা ও সার্বভৌমত্বের প্রতি হুমকি হতে পারে এরকম তথ্য;
  • পররাষ্ট্রনীতির কোন বিষয় যার দ্বারা বিদেশী রাষ্ট্রের অথবা আন্তর্জাতিক কোন সংস্থা বা আঞ্চলিক কোন জোট বা সংগঠনের সাথে বিদ্যমান সম্পর্ক ক্ষুণ্ণ হতে পারে এরকম তথ্য;
  • কোন বিদেশী সরকারের কাছ থেকে পাওয়া কোন গোপনীয় তথ্য;
  • কোন তথ্য প্রকাশের ফলে কোন তৃতীয় পক্ষের বুদ্ধিবৃত্তিক সস্পদের অধিকার ক্ষতিগ্রস্থ হতে পারে এরকম বাণিজ্যিক বা ব্যবসায়িক অসত্মর্নিহিত গোপনীয়তা বিষয়ক, কপিরাইট বা মেধাস্বত্ত (Intellectual Property Rights) সম্পর্কিত তথ্য;
  • কোন তথ্য প্রকাশের ফলে কোন বিশেষ ব্যক্তি বা সংস্থাকে লাভবান বা ক্ষতিগ্রস্থ করতে পারে এরকম তথ্য, যথাঃ

 ক. আয়কর, শুল্ক, ভ্যাট ও আবগারী আইন, বাজেট বা করহার পরিবর্তন সংক্রান্ত কোন  আগাম তথ্য;

খ. মুদ্রার বিনিময় ও সুদের হার পরিবর্তনজনিত কোন আগাম তথ্য;

গ. ব্যাংকসহ আর্থিক প্রতিষ্ঠানসমূহের পরিচালনা ও তদারকি সংক্রান্ত কোন আগাম তথ্য;

  • কোন তথ্য প্রকাশের ফলে প্রচলিত আইনের প্রয়োগ বাধাগ্রস্থ হতে পারে বা অপরাধ বৃদ্ধি পেতে পারে এরকম তথ্য;
  • কোন তথ্য প্রকাশের ফলে জনগণের নিরাপত্তা বিঘ্নিত হতে পারে বা বিচারাধীন মামলার সুষ্ঠ বিচার কার্য ব্যাহত হতে পারে এরকম তথ্য;
  • কোন তথ্য প্রকাশের ফলে কোন ব্যক্তির ব্যক্তিগত জীবনের গোপনীয়তা ক্ষুণ্ণ হতে পারে এরকম তথ্য;
  • কোন তথ্য প্রকাশের ফলে কোন ব্যক্তির জীবন বা শারীরিক নিরাপত্তা বিপদাপন্ন হইতে পারে এরকম তথ্য;
  • আইন প্রয়োগকারী সংস্থার সহায়তার জন্য কোন ব্যক্তি কর্তৃক গোপনে প্রদত্ত কোন তথ্য;
  • আদালতে বিচারাধীন কোন বিষয় এবং যা প্রকাশে আদালত বা ট্রাইবুনালের নিষেধাজ্ঞা আছে অথবা যার প্রকাশ আদালত অবমাননার শামিল এরকম তথ্য;
  • তদন্তাদীন কোন বিষয় যার প্রকাশ তদন্ত কাজে বিঘ্ন ঘটাতে পারে এরকম তথ্য;
  • কোন অপরাধের তদন্ত প্রক্রিয়া এবং অপরাধীর গ্রেফতার ও শান্তিকে প্রভাবিত করতে পারে এরকম তথ্য;
  • আইন অনুসারে কেবল একটি নির্দিষ্ট সময়ের জন্য প্রকাশের বাধ্যবাধকতা আছে এরকম তথ্য;
  • কৌশলগত ও বাণিজ্যিক কারণে গোপন রাখা বাঞ্ছনীয় এমন কারিগরী বা বৈজ্ঞানিক গবেষণালব্ধ কোন তথ্য;
  • কোন ক্রয় কার্যক্রম সম্পূর্ণ হওয়ার আগে বা ওই বিষয়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণের আগে সংশ্লিষ্ট ক্রয় বা তার কার্যক্রম সংক্রান্ত কোন তথ্য;
  • জাতীয় সংসদের বিশেষ অধিকার হানির কারণ হতে পারে এরকম তথ্য;
  • কোন ব্যক্তির আইন দ্বারা সংরক্ষিত গোপনীয়  তথ্য
  • পরীক্ষার প্রশ্নপত্র বা পরীক্ষায় প্রদত্ত নম্বর সম্পর্কিত আগাম তথ্য;
  • মন্ত্রীপরিষদের বৈঠকে উপস্থাপনীয় সার-সংক্ষেপসহ আনুষঙ্গিক দলিলাদি এবং এরকম বৈঠকের আলোচনা ও সিদ্ধান্ত সংক্রান্ত কোন তথ্য। তবে শর্ত থাকে যে, সিদ্ধান্ত গৃহীত হওয়ার পর অনুরুপ সিদ্ধান্তর কারণ এবং সিদ্ধান্তর ভিত্তিসমূহ প্রকাশ করা যাবে।

কোন প্রতিষ্ঠান তথ্য প্রদানে বাধ্য নয়

তথ্য অধিকার আইনে আটটি গোয়েন্দা সংস্থাকে তথ্য অধিকার আইনের আওতার বাইরে রাখা হয়েছে। আইনের ধারা ৩২ এ ‘কতিপয় সংস্থা বা প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে এই আইন প্রযোজ্য নয়’ তা বলা হয়েছে। এখানে বলা হয়েছে (১) এই আইনে যা কিছু থাকুক না কেন, তফসিলে উল্লেখিত রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা ও গোয়েন্দা কাজে নিয়োজিত সংস্থা বা প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে এই আইন প্রযোজ্য হবে না।

আইনের তফসিলে যে আটটি গোয়েন্দা সংস্থার নাম উল্লেখ করা হয়েছে, তা হলো-

১. জাতীয় নিরাপত্তা গোয়েন্দা সংস্থা (এনএসআই)

২. ডাইরেক্টরেট জেনারেল ফোর্সেস ইনটেলিজেন্স (ডিজিএফআই)

৩. প্রতিরক্ষা গোয়েন্দা ইউনিটসমূহ

৪. ক্রিমিনাল ইনভেস্টিগেশন ডিপার্টমেন্ট (সিআইডি), বাংলাদেশ পুলিশ

৫. স্পেশাল সিকিউরিটি ফোর্স (এসএসএফ)

৬. জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের গোয়েন্দা সেল

৭. স্পেশাল ব্রাঞ্চ, বাংলাদেশ পুলিশ

৮. র‌্যাপিড এ্যাকশন ব্যাটালিয়ন এর গোয়েন্দা সেল

তবে ধারা ৩২ এ আবার বলা হয়েছে-

উক্ত সংস্থা বা প্রতিষ্ঠানের কোন তথ্য দুর্নীতি বা মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনার সাথে জড়িত থাকলে সেক্ষেত্রে এই ধারা প্রযোজ্য হবে না। এবং এ ধরনের তথ্য প্রাপ্তির জন্য কোন আবেদন পেলে সংশ্লিষ্ট সংস্থা বা প্রতিষ্ঠান, তথ্য কমিশনের অনুমোদন গ্রহণ করে, আবেদন প্রাপ্তির ৩০ দিনের মধ্যে আবেদনকারীরে সেই তথ্য সরবরাহ করবে।

অর্থাৎ এই প্রতিষ্ঠানগুলি এই আইনের সম্পূর্ণ বাইরে নয়। চাহিত তথ্য দুর্নীতি বা মানবাধিকর লঙ্ঘনের ঘটনার সাথে জড়িত থাকলে সে তথ্য আবেদনের ৩০ দিনের মধ্যে প্রদান করতে হবে।

আলোচ্য বিষয় ২.৮: স্ব-প্রনোদিত তথ্য প্রকাশের ধারণা ও পদ্ধতি

স্ব-প্রনোদিত তথ্য প্রকাশ কী

স্ব-প্রনোদিত তথ্য প্রকাশ বলতে কোন কর্তৃপক্ষ কর্তৃক তার তথ্য স্বত:প্রনোদিত হয়ে উপযুক্ত ও সহজলভ্য মাধ্যমে প্রকাশ ও প্রচারকে বোঝায়, যেন জনগণ সহজে তথ্যে প্রবেশ করতে এবং প্রয়োজনে কাজে লাগাতে পারে।

তথ্য অধিকার আইনের Internal Spirit সর্বোচ্চ প্রকাশের নীতিকে নির্দেশ করে। সর্বোচ্চ প্রকাশের অধিকতর কার্যকর মাধ্যম হলো স্ব-প্রণোদিত তথ্য প্রকাশ। তথ্য অথিকার আইনের ধারা ৬ এ স্ব প্রনোধিত তথ্য প্রকাশের বিধান রয়েছে। এখানে বলা হয়েছে সহজ কথায় তা হলো-

প্রত্যেক কর্তৃপক্ষ তার গৃহীত সিদ্ধান্ত, কার্যক্রম কিংবা সম্পাদিত বা প্রস্তাবিত কর্মকাণ্ডের সকল তথ্য নাগরিকদের কাছে যাতে সহজলভ্য হয়, সেভাবে সূচীবদ্ধ করে প্রচার ও প্রকাশ করবে। তথ্য প্রচার ও প্রকাশ করার ক্ষেত্রে কোন কর্তৃপক্ষ কোন তথ্য গোপন করতে বা এর সহজলভ্যতা সংকোচিত করতে পারবে না।•সিদ্ধান্তগ্রহণ প্রক্রিয়ার বিবরণ বা পদ্ধতি

এই ধারায় প্রত্যেক কর্তৃপক্ষের ওপর প্রতিবছর একটি প্রতিবেদন প্রকাশের বাধ্যবধকতা আরোপ করা হয়েছে। এই প্রতিবেদনের পাশাপাশি কর্তৃপক্ষের সাংগঠিনিক কাঠামোর বিবরণ, কার্যক্রম, কর্মকর্তা-কর্মচারীদের দায়িত্ব, সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ার বিবরণ, সকল নিয়ম কানুন, আইন অধ্যাদেশ, বিধিমালা, প্রবিধানমালা, প্রজ্ঞাপন, নির্দশনা, ম্যানুয়েল ইত্যাদি বিষয় প্রকাশ করবে। এছাড়াও, কর্তৃপক্ষের কোন নীতি প্রণয়ন বা সিন্ধান্ত গ্রহণ করলে সেইসব নীতি বা সিদ্ধান্ত প্রকাশ করবে।

স্ব-প্রণোদিত তথ্য প্রকাশের মাধ্যম 

স্ব-প্রণোদিত তথ্য প্রচার ও প্রকাশ মাধ্যম হিসেবে দুটো পদ্ধতি ব্যবহারের কথা আইনে বলা আছে। এই পদ্ধতিগুলি হলো-

ক. প্রচলিত প্রচার ও প্রকাশ মাধ্যম: নোটিশ বোর্ড, মুদ্রিত লিপি, প্রকাশনা, গণমাধ্যম, সভা, গণশুনানী, ভিডিও প্রদর্শন, বিজ্ঞাপন, অডিও প্রচার, সাইন বোর্ড, বিলবোর্ড, দেয়াল লিখন, সিটিজেন চার্টার, মাইকিং, প্রেস বিজ্ঞপ্তি, এবং অন্যান্য অনুমোদিত মাধ্যম।

খ. অনলাইন  ও ডিজিটাল মাধ্যম: ওয়েব সাইট, অ্যাপস, নেটওয়ার্ক এবং অনুমোদিত অন্যান্য ডিজিটাল মাধ্যম

আলোচ্য বিষয় ২.৯: তথ্য কমিশন: গঠন কাঠামো, ভূমিকা ও কার্যাবলী

তথ্য কমিশন গঠন

তথ্য অধিকার আইন, ২০০৯ এর ধারা ১১ ও ১২ এর বিধান অনুসারে তথ্য কমিশন গঠন করা হয়েছে।

একজন প্রধান তথ্য কমিশনার ও দুজন তথ্য কমিশনার নিয়ে তথ্য কমিশন গঠিত। তথ্য অধিকার আইন, ২০০৯ বাস্তবায়নের সর্বচ্চ সংস্থা হলো তথ্য কমিশন। তথ্য কমিশন একটি সংবিধিবদ্ধ স্বাধীন সংস্থা।

তথ্য কমিশনের ক্ষমতা

  • কোন ব্যক্তিকে হাজির করার জন্য সমন জারি করা এবং শপথপূর্বক মৌখিক বা লিখিত প্রমাণ, দলিল বা অন্য কোন কিছু হাজির করতে বাধ্য করা
  • তথ্য যাচাই ও পরিদর্শন করা
  • হলফনামাসহ প্রমাণ গ্রহণ করা
  • কোন অফিসের কোনো তথ্য আনায়ন করা
  • কোন সাক্ষী বা দলিল তলব করে সমন জারি করা
  • এই আইনের উদ্দেশ্য পুরনকল্পে, বিধি দ্বারা নির্ধারিত অন্য যেকোন বিষয়

তথ্য কমিশনের কার্যাবলী

তথ্য কমিশনের কার্যাবলী: কমিশনের প্রধান কাজ তথ্য প্রদানকারী কর্তৃপক্ষ, তথ্য চাহিদাকারী নাগরিক, সরকার ও নাগরিক সমাজকে কেন্দ্র করে।

কর্তৃপক্ষ কেন্দ্রিক:

  • কর্তৃপক্ষ কর্তৃক তথ্য সংরক্ষণ, ব্যবস্থাপনা, প্রকাশ, প্রচার ও প্রাপ্তির বিষয়ে নির্দেশনা প্রদান
  • কর্তৃপক্ষের নিকট হতে তথ্য প্রাপ্তির লক্ষ্যে অনুরোধের পদ্ধতি নির্ধারণ
  • তথ্যের উপযুক্ত মূল্য নির্ধারণ
  • তথ্য অধিকার নিশ্চিতকরণের লক্ষ্যে কর্তৃপক্ষকে কারিগরী ও অন্যান্য সহায়তা প্রদান

নাগরিক কেন্দ্রিক:

  • নাগরিকদের তথ্য অধিকার সংরক্ষণ ও বাস্তবায়নের বিষয়ে নীতিমালা এবং নির্দেশনা প্রণয়ন ও প্রকাশ
  • নাগরিকদের তথ্য অধিকার সংরক্ষণ ও বাস্তবায়নের বিষয়ে বাধাসমূহ চিহ্নিত করা

নাগরিক সমাজ এবং শিক্ষা ও পেশাগত প্রতিষ্ঠান কেন্দ্রিক

  • তথ্য অধিকার সংরক্ষণ ও বাস্তবায়নের বিষয়ে গবেষণা করা এবং শিক্ষা ও পেশাগত প্রতিষ্ঠানকে অনুরূপ গবেষণা পরিচালনায় সহায়তা প্রদান;
  • সমাজের বিভিন্ন শ্রেণীর নাগরিকদের মধ্যে তথ্য অধিকার সংরক্ষণ ও বাস্তবায়নের বিষয়ে প্রচার এবং প্রকাশনা ও অন্যান্য উপায়ে তথ্য অধিকার বিষয়ে সচেতনতা বৃদ্ধি করা;
  • তথ্য অধিকার বিষয়ে গবেষণা, সেমিনার, সিম্পোজিয়াম বা ওয়ার্কশপের আয়োজন এবং এরকম অন্যান্য ব্যবস্থার মাধ্যমে গণসচেতনতা বৃদ্ধি করা এবং গবেষণালব্ধ ফলাফল প্রচার;

সরকার কেন্দ্রিক

  • তথ্য অধিকার সংরক্ষণের জন্য গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের সংবিধান বা আপাতত বলবৎ কোন আইনের অধীন স্বীকৃত ব্যবস্থাদি পর্যালোচনা করা
  • পর্যালোচনার কার্যকর বাস্তবায়নের জন্য অসুবিধাসমূহ চিহ্নিত করে তা দূর করতে সরকারের কাছে সুপারিশ প্রদান;
  • চিহ্নিত সমস্যাগুলো যথাযথ প্রতিকারের জন্য সরকারের নিকট সুপারিশ প্রদান;
  • তথ্য অধিকার বিষয়ক চুক্তিসহ অন্যান্য আন্তর্জাতিক দলিলসমূহের উপর গবেষণা করা এবং তা বাস্তবায়নের জন্য সরকারের কাছে সুপারিশ প্রদান;
  • নাগরিকদের তথ্য অধিকার সংরক্ষণ ও বাস্তবায়নের বিষয়ে তথ্য অধিকার সম্পর্কিত বিভিন্ন আন্তর্জাতিক দলিলের সাথে বিদ্যমান আইনের সাদৃশ্য পরীক্ষা করা এবং বৈসাদৃশ্য পরিলক্ষিত হওয়ার ক্ষেত্রে তা দূর করতে সরকার বা, ক্ষেত্রমত, সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে প্রয়োজনীয় সুপারিশ প্রদান;
  • তথ্য অধিকার বিষয়ে আন্তর্জাতিক দলিল অনুসমর্থন বা তাতে স্বাক্ষর প্রদানে সরকারকে পরামর্শ প্রদান;
  • তথ্য অধিকার সংরক্ষণ ও বাস্তবায়নের লক্ষ্যে প্রয়োজনীয় আইন ও প্রশাসনিক নির্দেশনা প্রণয়নের ব্যাপারে সরকারকে পরামর্শ ও সহযোগিতা প্রদান;

অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ কার্যাবলী

  • তথ্য অধিকার নিশ্চিতকরণের লক্ষ্যে বাংলাদেশের জন্য একটি ওয়েব পোর্টাল স্থাপন; এবং
  • তথ্য অধিকার সংরক্ষণ ও বাস্তবায়নের বিষয়ে অন্য কোন আইনে গৃহীত ব্যবস্থাদি পর্যালোচনা করা।

আলোচ্য বিষয় ২.৭: তথ্য অধিকার আইন ২০০৯ সবল ও দুর্বলদিক

তথ্য অধিকার আইন ২০০৯ বাংলাদেশের ইতিহাসে একটি মাইলফলক। এই আইনের মাধ্যমে তথ্য প্রাপ্তির অধিকারকে আইনগত স্বীকৃতি দেয়া হয়েছে। সাধারণ নাগরিক, নাগরিক সমাজ, বেসরকারী সংগঠন সমূহ এখন তথ্য পাওয়ার ক্ষেত্রে আইনগত ভিত্তির উপর দাঁড়িয়ে তথ্য চাইতে পারবে। তবে তথ্য অধিকার আইন ২০০৯-এ বিশ্লেষণে যে কোন নাগরিক সহজে উপলব্ধি করতে পারবেন যে এখানে ভাল-মন্দ উভয়দিক রয়েছে। নীচে ভাল-মন্দের দিকটি কয়েকটি দেশের আইনের বিধানের সাথে তুলনামূলকভাবে উপস্থাপিত হল।

বেসরকারী প্রতিষ্ঠান আইনের আওতায়:

সম্ভবত: বাংলাদেশের তথ্য অধিকার আইনেই কেবল সেবরকারী প্রতিষ্ঠানসমূহকে তথ্য প্রদানের বাধ্যবাধকতার মধ্যে আনা হয়েছে। সেই অর্থে এই আইন অন্যান্য দেশের আইনের তুলনায় প্রগতিশীল। তবে, কেবলমাত্র সরকারী বা বিদেশী অর্থে পরিচালিত অথবা সরকারী বা বিদেশী অর্থে পরিচালিত প্রকল্প আছে, এরকম প্রতিষ্ঠান এই আইনের আওতায় তথ্য দিতে বাধ্য থাকবে।

ব্যতিক্রমের ব্যাপকতা:

ব্রিটেনের আইনের উপর থেকে স্থগিতাদেশ রহিতের পরে ২০০৫ সাল থেকে মানুষ পুলিশের কাছেও বিশেষ কোন তথ্য জানতে চাইতে পারে। কিন্তু বাংলাদেশে তথ্য অধিকার আইন ২০০৯ এর বিধান অনুসারে মোট ২০টি পরিস্থিতিতে কর্তৃপক্ষ নাগরিককে তথ্য প্রদান করতে বাধ্য নয়। এর অর্থ হচ্ছে তথ্য প্রদানকারী সংস্থা স্বপ্রণোদিত হয়ে চাহিদাকৃত তথ্য না দিলে কিছু করার থাকে না।

তৃতীয় পক্ষের দায়িত্বের অস্পষ্টতা:

তথ্য অধিকার আইন ২০০৯-এ তৃতীয় পক্ষের সাথে জড়িত তথ্য প্রকাশের বা প্রদানের ব্যাপারটি স্পষ্ট নয়। এ জন্য সবচেয়ে বেশী যারা তথ্য প্রদানে সমস্যার মধ্যে পড়বেন তারা হলো দ্বিতীয় পক্ষ এবং এর ফলে নাগরিককে তথ্য পেতে অনেক বিড়ম্বনার শিকার হতে পারে। ভারতের তথ্য অধিকার আইনে তৃতীয় পক্ষের ভূমিকাকে একটি সময়সীমায় বেঁধে দেয়ায় নাগরিক যেমন সঠিক সময়ে তথ্য পাচ্ছে, তেমনি করে দ্বিতীয় পক্ষকে কোন সমস্যার মধ্যে পড়তে হচ্ছে না।

তথ্য মূল্য ও দারিদ্র:

তথ্য অধিকার আইন ২০০৯-এ প্রতিবন্ধী মানুষের জন্য একটি ধারা রাখা হয়েছে যাতে তাদের প্রতি কর্তৃপক্ষগুলো কোনভাবেই বৈষম্য তৈরী করতে না পারে (ধারা ৯(৮))। কিন্তু রাষ্ট্রের দায়িত্ব আছে দারিদ্রসীমার নিচে বসবাসকারী মানুষদেরকে বিনামূল্যে তথ্য প্রদানের ব্যবস্থা করা। ভারতের তথ্য অধিকার আইনের মাধ্যমে দারিদ্রসীমার নিচে বসবাসকারী মানুষগুলো সম্পূর্ণ বিনা মূল্যে তথ্য পেতে পারে। পরিসংখ্যান বলে বাংলাদেশের মোট জনসংখ্যার ৪০% মানুষ এখনও দারিদ্রসীমার নিচে বসবাস করছে। তাই সংগত কারণেই বলা যায়, মোট জনসংখ্যার মাত্র ৬০% নাগরিক তথ্য অধিকারের আওতাভুক্ত তথ্যগুলো পেতে আর্থিক কারণে বাবধাগ্রস্থ হবে না। এটি সামগ্রিক টেকসই উন্নয়নে এটি একটি বাধা।

অনুলিপি পাওয়ার সুযোগ নেই:

নেপালের কমন কোড-এর ক্ষমতা রয়েছে চাহিদা অনুযায়ী যে কোন পক্ষকে আদালতের মামলা পদ্ধতির অনুলিপি সরবরাহ করার। সেলক্ষ্যে পদ্ধতি ফির পরিমাণ ও সময়সীমাও জানানো হয়। কিন্তু বাংলাদেশের তথ্য অধিকার আইনে বাধ্যতামূলক নয় এরকম ২০টি পরিস্থিতিতে তথ্যগুলো অন্যায়ভাবে ব্যবহার করলে নাগরিকের আদালত থেকে মামলার অনুলিপি না পাওয়ার সম্ভাবনাকে বাদ দিয়ে দেওয়া যায় না।

তথ্য প্রদায়ক সুরক্ষা:

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের (হুইসেল ব্লোয়ার প্রটেকশন অ্যাক্ট ২০০৭) ও বৃটেনে (পাবলিক ইন্টারেস্ট ডিসক্লোজার অ্যাক্ট ১৯৯৮) আইনের মত বাংলাদেশের আইনেও তথ্য প্রদায়ক সুরক্ষার বিষয়টি রয়েছে (ধারা ৩১)। জাতিসংঘের তথ্যের স্বাধীনতা (২০০০)-এর নীতিমালায় খুবই স্পষ্টভাবে বলা আছে তথ্য প্রদায়ক সুরক্ষার বিষয়টি (পরিশিষ্ট ক দেখুন)। সুশাসন কিংবা টেকসই প্রশাসনের প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে তথ্যের স্বচ্ছতায় নাগরিকের বা প্রতিষ্ঠানের কর্তৃপক্ষের কোন সদস্যের ব্যক্তিগত উদ্যোগকে স্বাগতম জানানো গণতন্ত্রের একটি চাবি, যা দিয়ে দুর্নীতিগৃহের সমস্ত দরজা উন্মোচন করা সম্ভব। তাই তথ্য প্রদায়ক সুরক্ষায় বলা হয়, সরকারি কোন প্রতিষ্ঠানে কর্মরত কোন ব্যক্তি ওই প্রতিষ্ঠানের জনস্বার্থ পরিপন্থী কোন তথ্য জনসমক্ষে প্রকাশ করে এবং এর ফলে ওই প্রতিষ্ঠান অন্যায়ভাবে কোন ব্যবস্থা গ্রহণ করতে পারবে না। তবে সরকারি আচরণ বিধি ১৯৭৯-র ধারা ১৯-এ এক বিভাগের তথ্য অন্য বিভাগকে দেওয়া হলে শাস্তির ব্যবস্থা আছে।

আদালতে যাওয়ার সুযোগ নেই:

যুক্তরাষ্ট্রের Fredom of Information Act (১৯৬৬) অনুযায়ী যে কোন নাগরিক সরকারি নথি ও কাগজপত্র পরিদর্শন ও তথ্যপ্রাপ্তির অধিকার রাখেন। তথ্য পাওয়ার জন্য আবেদনের পর যদি ১০ দিনের মধ্যে সরবরাহ করা না হয় সে ক্ষেত্রে নাগরিক ফেডারেল কোর্টে অভিযোগ করতে পারেন। ফেডারেল কোর্টে আবেদন পেশের পরবর্তী ২০ দিনের মধ্যেই আবদেনকারীর সে তথ্য পাওয়ার অধিকার আছে কি নাই তা নির্ধারিত হয়ে থাকে। তথ্যপ্রাপ্তির অধিকারের প্রয়োগের ব্যাপারটি যুক্তরাষ্ট্রে এক রকম সহজতর প্রক্রিয়ায় পরিণত হয়েছে। যে কোন গুরুত্বপূর্ণ তথ্যপ্রাপ্তির আবেদনের সময় তথ্যের সঠিক বর্ণনা দেওয়া সম্ভব না হলেও একটি যুক্তিসঙ্গত বিবরণ দিলেও আবেদনটি গৃহীত হয়। কিন্তু বাংলাদেশে তথ্য অধিকার আইন ২০০৯ এর বিধিঅনুসারে নাগরিক যদি নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে কর্তৃপক্ষ থেকে তথ্য না পায় তাহলে প্রথমে নাগিরক কর্তৃপক্ষের ভিতরকার আপীল কর্তৃপক্ষের নিকট আপীল করতে পারে। তারপরও যদি নাগিরক আপীল কর্তৃপক্ষের সিদ্ধান্ত নিয়ে সন্তুষ্ট না থাকে তাহলে নাগরিক তথ্য কমিশনের নিকট অভিযোগ করতে পারে, কিন্তু আদালতে যাওয়ার কোন অধিকার নাগরিককে দেওয়া হয়নি।

সর্বোচ্চ পর্যাবেক্ষণ বা তদারকি ক্ষমতা এবং যে কোন নির্দিষ্ট বিধিমালায় বিচার ব্যবস্থার সর্বোচ্চ ক্ষমতা যদি একটি হাতে দেওয়া থাকে যে ক্ষমতা চ্যালেঞ্জ করা যায় না, তাহলে তা একচেটিয়া সৃষ্টি করে, যেটা ক্ষমতার অপব্যবহারকে উৎসাহিত করে। তাই সহজেই এটা অনুধাবন করা যায় যে, তথ্য কমিশনের তথ্য অধিকার নিয়ন্ত্রণ করার যে সর্বোচ্চ ক্ষমতা তা নাগিরকের ক্ষমতায়নের বাধা হয়ে দেখা দিতে পারে যা তথ্য অধিকার আইন ২০০৯-এর উদ্দেশ্যের পরিপন্থী। তাই তথ্য অধিকারের পর্যবেক্ষণ বা তদারকি ক্ষমতা তথ্য কমিশনে রেখে, তথ্য অধিকার নিয়ে বিরোধ নিষ্পত্তির ব্যবস্থা রাখা উচিত রাষ্ট্রীয় বিচার ব্যবস্থার উপর, তবেই সাংবিধানিক এবং তথ্য অধিকারের উদ্দেশ্য পূরণে তথ্য অধিকার আইন নাগরিকের ক্ষমতায়ন করবে।

উল্লেখ্য যে, তথ্য কমিশনের বিচার বা জবাবে সংক্ষুব্ধ ব্যক্তি যতি খুশি না হন তবে সংবিধানের ১০২ অনুচ্ছেদ অনুসারে উচ্চ আদালতে রিট করে প্রতিকার চাইতে পারে।

অনেকগুলি বিপরীতমুখী আইনের উপস্থিত:

দাপ্তরিক গোপনীয়তা আইন ১৯২৩-সহ বাংলাদেশে অনেক গুলো আইন আছে, যে সব আইন তথ্য অধিকারের বিপরীতমুখী। এইসব আইন রাষ্ট্রীয় বিচার ব্যবস্থায় কার্যকর থাকা অবস্থায় তথ্য অধিকার বলবৎ রাখা একধরণের স্ববিরোধিতা, যার ফলে নাগরিক অহেতুক বিভ্রান্তির শিকার হবে এবং সাথে সাথে নাগরিকের ভিতর স্থায়ী অনীহা তৈরী হবে যা দিয়ে তথ্য অধিকারের কার্যকারীতা বার বার বাধার সম্মুখ হবে। দাপ্তরিক গোপনীয়তা আইনে বাধাগ্রস্ত নয় কিন্তু অন্যান্য বিষয় যেমন ধারা ৮ এর তথ্য প্রকাশে অব্যাহতির যে বিষয়গুলো- যেমন- রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা, সার্বভৌমত্ব, সম্মান, পররাষ্ট্রনীতি, প্রতিরক্ষা অথবা কোন বিদেশী রাষ্ট্রের বা সংস্থার সাথে বিদ্যমান সম্পর্ক ক্ষুন্ন হওয়ার আশঙ্কা থাকলে কথাগুলো দিয়ে আরো বেশী করে তথ্য গোপন করার প্রবণতা দেখা দেবে। তাই তথ্য অধিকার নিশ্চিত করতে হলে এর বিপরীত স্রোতের আইনগুলো বাতিল করার পদক্ষেপ নেয়া প্রয়োজন।

রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তার তথ্যগুলোর চিরস্থায়িত্ব:

রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তার তথ্যগুলোর নিরাপত্তা কখনই চিরস্থায়ী হতে পারে না বরং রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তার সাথে জড়িত তথ্যগুলোর নিরাপত্তা নির্দিষ্ট সময় সাপেক্ষ ব্যাপার। ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনের কিংবা ১৯৭১ সালের স্বাধীনতা যুদ্ধের সময়কার রাষ্ট্রীয় পর্যায়ের তথ্যগুলো নিরাপত্তার কারণেই নাগরিকদের সামনে তুলে ধরা হয়নি। যার ফলশ্রুতিতে হাজার হাজার নিরাপরাধ নাগরিকের কিংবা বুদ্ধিজীবির মৃত্যু হল এবং আমরা এখনও স্বাধীনতা সংগ্রামের প্রকৃত ইতিহাস আমাদের নতুন প্রজন্মের কাছে তুলে ধরতে ব্যর্থ হয়েছি। তাই আমাদের শিক্ষা নেওয়া উচিত যে, রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তার সাথে জড়িত তথ্যের নিরাপত্তা চিরস্থায়ী হলে এটা শুধু বিদ্রোহ যা রক্তক্ষয়ী বিপ্লবের মধ্যেই সীমাবদ্ধ না থেকে একটা জাতিকে অন্ধকারময় করে তোলে। তাই রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তার সাথে জড়িত তথ্যগুলোর নিরাপত্তাকে একটা নির্দিষ্ট সময়ের গান্ডির মধ্যে বেঁধে দেওয়া রাষ্ট্রেরই অন্যতম সাংবিধানিক কর্তব্য, এটা হতে পারে ১২ বছর কিংবা ১৫ বছর। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রীয় গোপনীয় তথ্যগুলি সর্বোচ্চ ২৫ বছর পর উন্মুক্ত হয়ে যায়।

দীর্ঘসূত্রতা

আইন অনুসারে দেখা যাচ্ছে ক্ষেত্রবিশেষে তথ্য অধিকার আদায়ে ২১০ দিন লেগে যেতে পারে। তথ্য প্রদানের ক্ষেত্রে যদি তৃতীয় পক্ষ জড়িত থাকে, তাহলে দ্বিতীয় পক্ষ অর্থাৎ তথ্য প্রদানকারী ইউনিট ৩০দিন সময় পাবে। ৩০ দিন পর যখন সন্তোষজনক জবাব পাওয়া যাবে না, তথ্য চাহিদাকারী নাগরিক আপীল করলে, সেই আপীল নিষ্পত্তির সময়সীমা ১৫ দিন। আপীলের রায় তথ্য চাহিদাকারীর পক্ষে গেলে তথ্য পাওয়ার জন্য তাঁকে আরেও ৩০ দিন অপেক্ষা করতে হবে। কিন্তু এরপরও যদি নাগরিক সংক্ষুব্ধ থাকেন, তাহলে তিনি তথ্য কমিশনে অভিযোগ করবেন। অভিযোগ নিষ্পত্তির সর্বচ্চ সময়সীমা ৭৫ দিন। তথ্য কমিশনের রায় যদি তথ্য চাহিদাকারীর পক্ষে যায়, তবে নতুনভাবে তথ্য প্রদানের সময়সীমা হবে আরো ৩০ দিন।

দাপ্তরিক নোট শীট প্রসঙ্গে

২-এর চ ধারায় দাপ্তরিক নোট সিট বা নোটের প্রতিলিপি সংক্রান্ত আইনের এই বিধানটি তথ্য অধিকার আইনের মূল বিধানের পরিপন্থী। কারণ কোনো একটি বিষয়ে দাপ্তরিক নোটসিট জনগণের হাতে না এলে তারা বুঝতে পারবে না এই সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়াটি কেমনভাবে বাস্তবায়িত হয়েছে এবং কার কী ভূমিকা ছিল?

ভারতে প্রথমদিকে নোট সিট প্রদানকে অব্যাহিত দেয়া হয়েছিল। পরে সমাজের বিভিন্ন গোষ্ঠীর চাপে নোট শিট দেয়া বাধ্যতামূলক করা হয়। বাংলাদেশেও বিভিন্ন নাগরিক ও পেশাজীবী সংগঠন এই ধারাটি পুনর্বিবেচনার জন্য সরকারের কাছে দাবি জানিয়েছে।